Ticker

6/recent/ticker-posts

নবজাতকের যত্ন ও পরিচর্যা



আমাদের এই পৃথিবী হাজারো বিস্ময় এর মধ্যে একজন নতুন শিশুর জন্ম সৃষ্টিকর্তার দেওয়া এক পরম আশীর্বাদ ও বিস্ময়ের নাম। প্রতিটি অভিভাবকের সবচেয়ে আনন্দঘন সময় হচ্ছে তার শিশুর পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময়। যখন শিশু পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হয় তখন মা-বাবা ও তার পরিবার-পরিজনদের মধ্যে ভয় দুশ্চিন্তা আনন্দ সবকিছুই একসাথে বিরাজ করে থাকে ।

একটি সুস্থ ও পরিপূর্ণ শিশু জন্মাবে সেটা প্রতিটি মানুষেরই কামনা থাকে। পৃথিবীতে আসার পরপরই সদ্য জন্ম নেওয়া শিশু বা নবজাতকের রয়েছে বিশেষ যত্নের প্রয়োজন। সেই সাথে অবশ্যই দরকার বাড়তি সতর্কতা ।তাই আমাদের আজকের লেখা বা টিপস গুলো প্রতিটা অভিভাবকের জন্য আত্মবিশ্বাসের জন্ম দিবে।


সূচিপত্র

  • নবজাতক কাকে বলে
  • জন্মের পর মুহূর্তেই করণীয়
  • নবজাতকের গোসল
  • নবজাতকের পোষাক
  • গরমে  নবজাতকের যত্ন করণীয় ও পরিচর্যা
  • শীতে নবজাতকের যত্ন করণীয় ও পরিচর্যা
  • নবজাতকের যত্ন কিভাবে নিতে হয়

নবজাতক কাকে বলে

একটি শিশু জন্মের পর থেকে 28 দিন পর্যন্ত সময়কালকে নবজাতক পিরিয়ড।  হিসেবে গণ্য করা হয়৷এই সময় প্রতিটি মা এবং তার সন্তানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় কাল ।একজন নবজাতককে সুস্থ রাখতে তার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কোনো বিকল্প নেই ।


কেননা একটা নবজাতকের শরীর খুবই কোমল এবং খুব দ্রুতই রোগ জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে তাই এই সময় তার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে এ সময়টি আপনার এবং আপনার শিশু উভয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ৷


আরো পড়ুন ৬ মাসের শিশুর খাবারের তালিকা


 জন্মের পর এক ঘন্টা অর্থ জন্মের পরে প্রথম ঘণ্টা একটি শিশুর জন্য অপরিহার্য ।তাই এই সময়টাকে একটি নবজাতকের জন্য "গোল্ডেন ওয়ান  আওয়ার "হিসেবেও অনেক ডাক্তার আখ্যা দিয়ে থাকে।


জন্মের পর মুহূর্তেই করণীয়


শিশু জন্মের ঠিক পরের মুহূর্তেই আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে শিশুকে মায়ের দুধ অর্থাৎ শাল দুধ খাওয়ানো। এটা একটা নবজাতকের জন্য প্রথম টিকা হিসেবে কাজ করে থাকে। এই শাল দুধ পরিমাণে কম হলেও এটার পুষ্টি গুণ অনেক বেশি।


 শাল দুধ খাওয়ালে একটি নবজাতক বিভিন্ন ধরনের  রোগ থেকে বাঁচতে পারে। যেমন শিশুর রাতকানা, জন্ডিস ও অন্যান্য রোগ হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম থাকে।  একটি শিশু জন্মের পর থেকে ছয়  মাস পর্যন্ত তাকে বুকের দুধ পান করানো উচিত।


নবজাতকের গোসল


একটা শিশুর জন্মের পর থেকে তিন দিনের মধ্যে শিশুকে কোনভাবেই গোসল করানো যাবেনা' সাধারণত ডাক্তাররা একটি শিশুর নাভি না শুকানো পর্যন্ত তাদেরকে গোসল করাতে নিষেধ করে থাকেন।তবে ততদিন পর্যন্ত আপনি আপনার শিশুর গা মুছে দিতে পারেন।


একটি শিশুকে প্রথমবার গোসল করানো এটা আসলে একটা অন্যরকম অভিজ্ঞতা। যাকে ঠিকমতো ধরাই যায়না অর্থাৎ এত ছোট একটা শরীর তাকে কিভাবে গোসল করাবে এটা আসলে  বড়ই মুশকিল।


আরো পড়ুন বাচ্চাদের স্বাস্থ্য ভালো করার উপায়


 একটা সমতল  জায়গায় শিশুকে একটা নরম তোয়ালের উপর শুয়ে দিন।হালকা গরম পানিতে নরম কাপড় ভিজিয়ে সেটাকে ভিজিয়ে নিয়ে প্রথমে শিশুর মাথাটা আলতো করে মুছে দিন।  মুছার পরপরই একটা নরম শুকনা কাপড় দিয়ে মুছে দিন। কেননা শিশুর মাথা যদি ভেজা থাকে তাহলে শিশুটির ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। এরপর আস্তে আস্তে গলা বুক  বা পুরো শরীর মুছে দিন।


নবজাতকের পোশাক


একজন নবজাতককে সরাসরি কোন উলের  যে পোশাকগুলো আছে সেগুলো পড়ানো উচিত নয়। চিকিৎসকরা বলে থাকেন যে উলের  ক্ষুদ্র লোমে  শিশুদের এলার্জি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে এই ক্ষেত্রে সুতির পোশাক গুলো আছে সেগুলো পরিয়ে তার উপর উলের সোয়েটার চাপাতে পারেন। 


 আমাদের দেশে অনেক ধরনের নবজাতকের উপযোগী পোশাক পাওয়া যায়।  যেগুলো তৈরি হয় সুতি  ও অন্যান্য উষ্ণ কাপড়ের  মাধ্যমে।  নবজাতকের পোশাকের মধ্যে রয়েছে স্যুট এবং রম্পার যা জামা ও প্যান্ট এর কাজ একসঙ্গে করে।  তাছাড়া রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বেবি সাক।  তবে সবসময় খেয়াল রাখা উচিত নবজাতককে এমন কাপড় পড়ানো উচিত যেগুলো সামনে থেকে খোলা যায়।  নবজাতকের আচ্ছাদন হিসেবে একমাত্র সুতি কাপড় ছাড়া অন্য কোন কাপড় পড়ানো উচিত না।


গরমে  নবজাতকের যত্ন করণীয় ও পরিচর্যা


গরমকালে শিশুর জন্য প্রয়োজন পাতলা ও ঢিলা ঢালা পোশাক। তবে শিশুকে মশা ও পোকামাকড়ের কামড় থেকে নিরাপদ রাখার জন্য আপনি ফুলহাতা যে পাতলা পোশাক বা প্যান্ট পড়াতে পারেন। তবে সেই ক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে সরাসরি থাকে ফুলহাতা পোশাক না পরিয়ে আপনি শিশুকে মশারির নিচে রাখতে পারেন অথবা ঘরে যেন মশা না ঢুকতে পারে সেই ব্যবস্থা নিতে পারেন


আরো পড়ুন শিশুদের জ্বর হলে করণীয়


গরমকালে শিশুকে সরাসরি পাখার বাতাসে রাখা যাবে না তাকে একটু দূরে রাখতে হবে। ঘরে যেন পর্যাপ্ত পরিমাণে আলো বাতাস থাকে এবং পোকামাকড় না আসতে পারে সেদিকেও বিশেষ নজর রাখতে হবে। 


মায়ের বুকের দুধ একটি শিশুর জন্য পর্যাপ্ত খাবার।  আপনার শিশু পর্যাপ্ত খাবার বা তরল গ্রহণ করছে কিনা সেটা বুঝার জন্য শিশু কতবার মুত্র ত্যাগ করছে সেখান থেকে ধারনা নিন। সে ক্ষেত্রে দিনে ছয় থেকে আট  বার একটি শিশুর জন্য স্বাভাবিক বলা যায়। শিশু যদি প্রক্রিয়াজাত দুধ বা পাম্প করা দুধ পান করে সে ক্ষেত্রে সেটা রিফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই তিন ঘন্টার বেশি সময় ঘরের সাধারণ তাপমাত্রায় এটা রাখা যাবে না। 


গরমকালে শিশুর স্বাভাবিক স্নায়বিক বিকাশ বা ঘুম ভালো হওয়ার জন্য আপনার শিশুকে প্রতিদিন তেল মালিশ করতে পারেন।  তবে অবশ্যই লক্ষণীয় বিষয় যে তেল মালিশ এরপর কুসুম গরম পানি দিয়ে শিশুর শরীর ধুয়ে দিতে হবে। যতটা পারা যায় শিশুকে ডাইপার না পড়ানো উত্তম এতে গায়ে বাতাস লাগবে এবং ঘামের  পরিমাণ কম হবে। 


দেহের যেসব ভাজ যুক্ত জায়গায় রয়েছে সে গুলোকে মুছে দিতে হবে তা না হলে ফাংগাসের আক্রমণ ঘটতে পারে। ভাঁজ  যুক্ত জায়গা বলতে গলা ঘাড় বাহুমূল হাঁটুর নিচের অংশ ইত্যাদি কে বোঝানো  হয়েছে। 


অনেক সময় দেখা যায় পানিশূন্যতার কারণে নবজাতকের গরমকালে জ্বর হয়ে থাকে।  সেক্ষেত্রে ভয় না পেয়ে প্রথমে তাকে আদ্র করার চেষ্টা করতে হবে। যদি এতেও কোন কাজ না হয় অর্থাৎ তাপমাত্রা না কমে তাহলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। 


শীতে নবজাতকের যত্ন করণীয় ও পরিচর্যা


একটা নবজাতকের ক্ষমতা খুবই কম হয়ে থাকে তাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে। এতে দেখা যায় তারা অল্প শীতেই কাবু হয়ে যায়। যেসব বাচ্চারা মায়ের গর্ভে পূর্ণ ৩৭ সপ্তাহ ছিল তাদের ক্ষেত্রে অনেকটা জটিলতা কম থাকে। কিন্তু এরচেয়ে যারা কম সময় থাকে তাদের ক্ষেত্রে বিশেষ সর্তকতা প্রয়োজন রয়েছে। 


এই সময় আপনি ঘরের দরজা-জানালা অফ করে ঘরের উষ্ণতা নিশ্চিত করা যেতে পারে। নবজাতককে অন্যত্র না রেখে অর্থাৎ আলাদা কোন জায়গায় না রেখে মায়ের বুকের উপর রাখুন যেন নবজাতকের শরীরের  সঙ্গে মায়ের শরীর  একত্রে থাকে।


আরো পড়ুন নবজাতক শিশুদের ঠান্ডা লাগলে করণীয়


নবজাতককে উষ্ণ কাপড়ে ঢেকে রাখুন। জন্মের পর পরই আমরা দেখতে পাই নবজাতকের শরীরে এক ধরনের সাদা আবরণ এটা কখনোই তুলে বা মুছে ফেলবেন না নোংরা মনে করে। এটা নবজাতকের দেহের তাপমাত্রা ধরে রাখে এবং জীবাণু সংক্রমণ প্রতিরোধ করে। ত্বককে  দেয় সুরক্ষা। এটি সাথে সাথেই মুছা উচিত নয়।


 শীতে অনেকেই দেখা যায় বাচ্চার নাভিতে  তেল মেখে রোদে শুয়ে রাখেন এতে বাচ্চার নাভিতে সংক্রমণ হতে পারে। নাভিতে কোনকিছুই লাগানোর প্রয়োজন নেই একবার জীবাণুনাশক তরল লাগানো পর। 


ডায়পার  কোনভাবেই ছয় ঘণ্টার বেশি শরীরে রাখা যাবে না। এতে রেশ হতে পারে।  শীতের সময় অবশ্যই শিশুদের হাত মোজা পা মোজা কানটুপি পড়াতে হবে। উল বা পশমে এলার্জি হলে এগুলো পরিহার করে সুতির জামা পড়াতে পারেন। 


নবজাতকের যত্ন কিভাবে নিতে হয়


শিশুর বা নবজাতককে সংস্পর্শে আসার আগে অবশ্যই নিজের হাত  সবসময় সেনিটাইজার বা পরিষ্কারভাবে ধুয়ে নিন। এ দিকেও খেয়াল রাখতে হবে যে শিশুকে কেউ খুলে নেওয়ার আগে সে সঠিকভাবে হাত পরিষ্কার করে নিয়েছে কিনা। কেবলমাত্র হাত ধুয়েই বা পরিষ্কার করে  নিয়ে পরেই  শিশুকে কোলে নিতে হবে


একটা বিষয় খেয়াল করলে দেখা যায় শিশুদের নখ  গুলো খুব দ্রুত বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে দেখা যায় তাদের নখের আঘাতে ত্বকের বিভিন্ন স্থানে আঁচড় লেগে যায়।  আর যদি আঁচড়  গভীর হয় তাহলে ঘা হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে থেকে যায়। তাই শিশুদের নখগুলো অল্প বড় হওয়ার পরেই সুন্দর করে কেটে দিন।


যখন শিশু ঘুমাবে তখনই তার নখ কাটার চেষ্টা করুন। তাহলে শিশুর নড়াচড়া করবে না এবং কেটে যাবার ভয় থাকবে না। আর যদি জেগে থাকা অবস্থায়ই নখ কাট তে চান তাহলে অবশ্যই কারো সাহায্য নিন।  নেইল কাটার বা  কাঁচি যেটা  দিয়েই কাটেন না কেন অবশ্যই তা সেনিটাইজার করে নিবেন বা জীবানুনাশক পানিতে একবার হলেও ধৌত করে নিন।


শিশুদের চোখে আমরা অনেক সময় ময়লা দেখতে পাই এই ময়লা গুলো  ভুলেও  হাত দিয়ে খোটা  যাবে না।  কাপড়ের টুকরো হালকা গরম পানিতে চুবিয়ে হালকা করে চেপে পানি ঝরিয়ে বাচ্চার চোখটা মুছে দিন।অনেক সময় বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর সময় বাচ্চার চোখে দুধ চলে যেতে পারে সে ক্ষেত্রে বাচ্চার চোখের প্রদাহ হয়। এখানে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। আবার অনেক সময় দেখা যায় কিছুকিছু বাচ্চার ক্ষেত্রে চোখ দিয়ে পানি পড়ে। তাদের চোখগুলো কিছুক্ষণ পরপর নরম কাপড়ে মুছে দিন দুই এক  মাস পর এটা ঠিক হয়ে যাবে। আর যদি বেশি সমস্যা মনে হয় তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

 

বাচ্চাদের খাবার যেহেতু  মায়ের বুকের দুধ তাই এটা খাওয়ার কারণে শিশুর জিহ্বায় সাদা আস্তর পড়ে যায়। তাই একটা নরম কাপড় দিয়ে ছোট বাচ্চাদের জিহবা পরিষ্কার করে দিন। 


কখনই নবজাতকের কানকে কটন বাড দ্বারা পরিষ্কার করতে যাবেন না। এতে বাচ্চার কানের পর্দা ছিঁড়ে যেতে পারে। তাই বাচ্চার কানের উপরিভাগ নরম সুতি কাপড় দিয়ে পরিষ্কার রাখতে পারেন। ঠিক তেমনি ভাবে বাচ্চার নাকের ক্ষেত্রেও কটনবার দিয়ে নাক পরিষ্কার করতে যাবেন না। নরম সুতি কাপড় দিয়ে তার নাক এর ময়লা পরিষ্কার করে দিন। খেয়াল রাখবেন যদি শিশুর নাকে সর্দি বা ময়লা জমে থাকে এবং নাক বন্ধ হয়ে যায় তাহলে শিশু মুখ দিয়ে শ্বাস প্রশ্বাস নেয়। সেসময় শিশু দুধ খেতে চায় না। এদিকে অবশ্যই বিশেষ সর্তকতা অবলম্বন করবেন। 


পরিশেষে আপনার শিশুকে রাখুন যত্নে, ভালোবাসায় এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মধ্যে। শিশুর ছোটখাটো কোনো সমস্যা কে  হেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। তাদের  প্রতি ভালোবাসা, যত্ন আপনার শিশুকে করে তুলবে ফিট ও সুস্থময়। 




Post a Comment

0 Comments