Ticker

6/recent/ticker-posts

হিট স্ট্রোক কি ,কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার



 হিট স্ট্রোক কি ,কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার

বর্তমানে আমরা গরমের উৎপাতে সবারই নাজেহাল অবস্থা। সবাই গরমে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়ছে।  হাঁসফাঁস করছে সারা বাংলার মানুষ জন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তাঘাটে একজন মানুষেরও দেখা নেই। সবাই বেশ ক্লান্ত গ্রীষ্মের এই তপ্ত  সূর্য রশির দাপটের সামনে। আর আমরা যারা কোন উপায় না পেয়ে বাহিরে বের হচ্ছি তারাও নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

আমাদের সবারই মনে রাখা অত্যন্ত জরুরী যে অনেকে হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছে। তাই বর্তমানে পরিস্থিতির কারণে আমাদের সচেতন হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। নিজে সচেতন হবো পাশাপাশি আমাদের আসে পাশের সবাইকে এই বিষয়ে সচেতন করবো।

সূচিপত্র

  • হিট স্ট্রোক কি ,কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার
  • হিট স্ট্রোক কি
  • হিট স্ট্রোকের লক্ষণ
  • হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচার উপায়
  • হিট স্ট্রোক এর প্রাথমিক চিকিৎসা

হিট স্ট্রোক কি 

হিট স্ট্রোক গরমের সময়ের একটি খুবই মারাত্মক স্বাস্থ্যগত সমস্যার নাম। চিকিৎসা শাস্ত্র অনুযায়ী গুরুতর তাপজনিত অসুস্থতা অর্থাৎ আমাদের শরীরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) ছাড়িয়ে গেলে তাকে হিট স্ট্রোক বলা হয়। আমাদের শরীরের স্বাভাবিক অবস্থায় রক্ত দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে।

যদি আমাদের শরীরের তাপমাত্রা কোন কারণে বেড়ে যায় তাহলে তক্কের রক্তনালী প্রসারিত হয়ে যায় এবং তা অতিরিক্ত তাপ পরিবেশে ছড়িয়ে দেয়। প্রয়জনে এটা ঘামের মাধ্যমে তাপমাত্রা কমিয়ে ফেলে। কিন্তু যখন প্রচন্ড গরম ও আদ্র পরিবেশে বেশি সময় অবস্থান অথবা পরিশ্রম করলে সেই মুহূর্তে আর তাপ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। যার ফলে আমাদের শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বিপদ সীমা ছাড়িয়ে ফেলে এবং যার ফলে হিটস্ট্রোক দেখা যায়।

হিট স্ট্রোকের লক্ষণ

আমাদের দেহের নানা রকম প্রতিক্রিয়া ঘটতে দেখা দেয় তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে। প্রাথমিকভাবে হিট স্ট্রোক হওয়ার আগে অপেক্ষাকৃত কম মারাত্মক হিট ক্র্যাম্প  অথবা হিট এক্সহসশন দেখা দিতে পারে। আমাদের শরীরে হিটক্র্যাম্প  হলে শরীরের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। যেমন মাংসপেশিতে ব্যথা হয় ,শরীর দুর্বল লাগে ,প্রচন্ড পিপাসা পায়। এর পরের ধাপে যেসব সমস্যা দেখা দেয় তা হল দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস ,মাথাব্যথা, ঝিমঝিম করা, বমি ভাব, অসংলগ্ন আচরণ ইত্যাদি হতে পারে। সাধারণত এই দুই ক্ষেত্রেই আমাদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং আমাদের শরীর অত্যন্ত ঘামতে থাকে। ঠিক এই সময় যদি আমরা দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ না করি  তাহলেই হিট স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। চলুন নিচে হিট স্ট্রোকের লক্ষণ গুলো জেনে নেওয়া যাক। 

  • প্রচন্ড গরমের কারণে আমাদের মাথাব্যথা হতে পারে। এছাড়া আমাদের মাইগ্রেন টিগার করতে পারে। এটি একটি হিট স্ট্রোকের অন্যতম লক্ষণ হতে পারে। 
  • সাধারণত হিটস্ট্রোক করার আগে ব্যক্তি অনেক বেশি কৃষ্ণা অনুভব করে থাকে। সেইসাথে ডিহাইড্রেটেড এবং অনেক ক্ষেত্রে আরষ্টতা অনুভব করে থাকে। এই সময় শরীর তার নিজেকে ঠান্ডা করার জন্য অতিরিক্ত ঘাম  তৈরি করে। 
  • আমাদের হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত হতে পারে হিট স্ট্রোকের আগে। সে ক্ষেত্রে হিট স্ট্রোকের লক্ষণ হলো শ্বাসকষ্ট এবং দ্রুত ও ভারি শ্বাস-প্রশ্বাস। 
  •  অনেক সময় মাথা ব্যথা ,দ্রুত হৃৎস্পন্দন ও হাইপারভেন্টিলেশন থেকে আমাদের অক্সিজেনের অভাব  হয় আর এই অক্সিজেনের অভাবের কারণে হিট স্ট্রোকের আগে অনেকের বমি বমি ভাব হতে পারে। 
  • হিট স্ট্রোক হওয়ার আগে মানুষ অনেক সময় বিরক্ত বোধ করতে পারে ,রাগান্বিত হতে পারে ,এমনকি অযুক্তিক কথাও বলতে পারে এবং পাগলের প্রলাপ বকতে পারে। 
  • এছাড়া হিটস্ট্রোকের আরেকটি অন্যতম লক্ষণ হচ্ছে ব্যক্তি অসংলগ্ন কথা বলতে থাকা অর্থাত্ কথা জড়িয়ে যাওয়া। 
  • অনেক সময়  হিট স্ট্রোকের আগে আমাদের পেশীতে ব্যাথা হয়ে থাকে। যদিও আমরা এটা আমাদের শরীরে স্বাভাবিক ভেবে গুরুত্ব দেই না। 
  • শরীর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কাজ করে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে। যার ফলে শরীর আরও দুর্বলতা ও ক্লান্তি তৈরি করে। এমনকি ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। এগুলো হিটস্ট্রোকের  লক্ষণ। 
  • অনেক সময় প্রচন্ড গরম থাকা সত্ত্বেও আমাদের শরীরে ঘাম হয় না এর মানে হচ্ছে শরীরের ঘাম হওয়ার মতো পানি আর নেই বা শরীর প্রাকৃতিক যে শীতল প্রকৃতির রয়েছে তা আর কাজ করছে না। এটা হিট স্ট্রোকের অন্যতম একটি লক্ষণ। 
  • মোটকথা হিট স্ট্রোকের প্রাথমিক লক্ষণগুলো হচ্ছে আচরণগত পরিবর্তন ,বিভ্রান্তি ,প্রলাপ ,মাথা ঘোরা ,দুর্বলতা, শরীরের দুলনি, কথাবার্তা জড়িয়ে আসা ,বমি বমি ভাব হওয়া, অনেক ক্ষেত্রে খিচুনি ,প্রস্রাব ও মলত্যাগের নিয়ন্ত্রণ অক্ষমতা ইত্যাদি। এরকম দেখা দিলে অবশ্যই আমাদের যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে। 

হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচার উপায়

গরমের সময় আমাদের কিছু সর্তকতা অবলম্বন করে চললে হিট স্ট্রোকের বিপদ থেকে বেঁচে থাকতে পারবো। যেমন

  •  গরমের সময় হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরিধান করা। কাপড়ের ক্ষেত্রে সাদা বা হালকা রঙের কাপড় পরা। তবে সুতি কাপড় হলে বেশি ভালো হয়। 
  • যতটুকু সম্ভব আমাদের ঘরের ভেতরে অথবা যেসব জায়গায় ছায়া রয়েছে অর্থাৎ ছায়াযুক্ত স্থানে অবস্থান করতে হবে। যদি আমরা বাইরে যেতে চাই তাহলে সেক্ষেত্রে আমাদের মাথা জন্য চওড়া কিনারা যুক্ত টুপি ক্যাপ কিংবা ছাতা ব্যবহার করতে হবে। 
  • আমরা অনেকেই বাহিরে কাজএ  নিয়োজিত থাকি সেই ক্ষেত্রে মাথার প্রটেকশন এর জন্য ছাতা বা মাথা ঢাকার জন্য কাপড় জাতীয় কিছু ব্যবহার করতে হবে। 
  • হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচার জন্য প্রচুর পরিমাণে পানি এবং অন্যান্য তরল পান করতে হবে। কেননা গরমে আমাদের শরীর থেকে ঘামের সঙ্গে পানি ও লবণ দুইটাই বের হয়ে যায়। তাই আমরা পানির সাথে সাথে লবণযুক্ত পানীয় যেমন খাবার স্যালাইন, লাচ্ছি ,বিভিন্ন ধরনের ফলের রস ইত্যাদি পান করবো। 
  •  যতটুকু সম্ভব যেসব পানীয় তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে যেমন চা ও কফি  এগুলো পরিহার করতে হবে। 
  • এই গরমের মধ্যে শ্রমসাধ্য যেসব কাজ সেগুলো করা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করতে হবে। যদি সম্ভব না হয় তাহলে রাতে অথবা খুব সকালে করতে হবে।  আর যদি দিনেই করতে হয় তবে অবশ্যই কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে বিশ্রাম নিতে হবে সাথে প্রচুর পরিমাণে পানি ও স্যালাইন পান করতে হবে। 

হিট স্ট্রোক এর প্রাথমিক চিকিৎসা

আমরা যদি কোনক্রমে হিট স্ট্রোক  আক্রান্ত হয়ে যায় কিংবা কোন লক্ষণ দেখে যদি বুঝতে পারি এটা হিট স্ট্রোকের লক্ষণ তাহলে আমাদের যেসব পদক্ষেপ বা প্রাথমিক চিকিৎসা নিবো  তা নিচে দেওয়া হল। 

  • প্রাথমিকভাবে যদি রোগীর হিট ক্র্যাম্প  বা হিট এক্সহশন দেখা দেয় তখন সেই ক্ষত্রে রোগীকে দ্রুত শীতল কোনো স্থানে নিয়ে যেতে হবে। যদি সম্ভব হয় তাহলে ফ্যান বা এসি ছেড়ে দিতে হবে। ভেজা কাপড় দিয়ে রোগীর শরীর মুছে দিন। সম্ভব হলে তাকে গোসল করিয়ে দিন। তাকে পানি ও খাবার স্যালাইন পান করান। ভুলক্রমেও তাকে চা বা কফি পান করাবেন না। 
  • এখন যদি আমাদের হিট স্ট্রোক আক্রান্ত হয়ে যায় তবে এখানে আর কোন প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ নেই। তাকে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। সেই ক্ষেত্রে রোগীর আশে পাশে যারা থাকবে তাদের কিছু করণীয় রয়েছে।তা হলো : রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব শীতল স্থানে নিয়ে যান।  তাঁর শরীরের কাপড় গুলো খুলে দিন। তার শরীরকে পানিতে ভিজিয়ে তাকে বাতাস করুন অর্থাৎ তাঁর শরীরের তাপমাত্রা কমাতে থাকুন। যদি সম্ভব হয় তাহলে তার কাঁধে ,বগলে, কুঁচকিতে বরফ দিয়ে দিন। যদি রোগির  জ্ঞান থাকে তাহলে তাকে খাবার স্যালাইন খাওয়ান।  যতদ্রুত সম্ভব তাকে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো হিটস্ট্রোকে অজ্ঞান হওয়া রোগী শ্বাস-প্রশ্বাস ও নারী চলছে কিনা সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখা। যদি সম্ভব হয় তাহলে তাকে কৃত্রিমভাবে নিঃশ্বাস ও নারী চলাচলের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। 

গ্রীষ্মের এই গরমের মধ্যে আমি ,আপনি বা যে কেউ হিট স্ট্রোকে  আক্রান্ত হয়ে  জীবন বিপদাপন্ন  হতে পারে।  তাই আমাদের এই গরমে তৎক্ষণাৎ প্রতিরোধ বা মোকাবেলার উপায় গুলো যদি জানা থাকে তাহলে আমরা খুব সহজেই এই পরিস্থিতি থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারবো।  এই গরমে যথাযথ সর্তকতা অবলম্বন করে হিট স্ট্রোক থেকে আমাদের সবাইকে বেঁচে থাকতে হবে।


Post a Comment

0 Comments