Ticker

6/recent/ticker-posts

ইসুবগুলের ভুষির স্বাস্থ্য উপকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

 


ইসুবগুলের ভুষির স্বাস্থ্য উপকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

আমাদের বাংলাদেশের ইসুবগুলের ভুষি খুবই পরিচিত একটি নাম। শুধু যে আমাদের বাংলাদেশের তাই নয় বরং পুরো উপমহাদেশেই এই নামটি খুবই পরিচিত। এটার নানাবিধ উপকার সম্পর্কে আমরা  অনেকেই জানিনা। আমরা অনেকেই ভেবে থাকি নামের সাথে  যেহেতু "গুল" শব্দটি রয়েছে তারমানে এটা এক ধরনের হয়তো পাপরি হবে।  কিন্তু আসলে এটা পাপড়ির  সাথে কোন সম্পর্ক নেই। 

বরং এটা এক ধরনের বীজ মূলত এটা বীজের খোসা সঙ্গে সম্পর্কিত যাকে আমরা ইসুবগুলের ভুষি বলে অভিহিত করে থাকি। আমরা এটা মূলত রোজার মাসে অনেক বেশী ব্যবহার করে থাকি। সারাদিনের রোজা রাখার ক্লান্তি এটা খাওয়ার  পর অনেকটা স্বস্তি দেয় অর্থাৎ এটা সারাদিনের ক্লান্তি দূর করার অন্যতম একটি উপাদান। 

শুধু যে রোজার মাসে তা কিন্তু নয় এটা আমরা বিভিন্ন কাজে আমাদের নিজেদের জন্য ব্যবহার করে থাকি। এটা আমাদের শারীরিক বিভিন্ন ধরনের রোগ থেকে মুক্তি দিয়ে থাকে। এখন আমরা এই ইসুবগুলের ভুষি সম্পর্কে বিভিন্ন ব্যবহারবিধি।,খাওয়ার নিয়ম ,উপকারী ইত্যাদি সম্পর্কে নিচে জানব।

সূচিপত্র

  • ইসুবগুলের ভুষির স্বাস্থ্য উপকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
  • ইসুবগুলের ভুষি কি ও এর উৎপত্তি
  • ইসুবগুলের ভুষি খাওয়ার নিয়ম
  • খালি পেটে ইসবগুলের ভুসি খেলে কি হয়
  • ইসুবগুলের ভুষির উপকারিতা
  • কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে ইসবগুলের ভুষি
  • মূত্রের সমস্যা দূর করতে ইসবগুলের ভুষি
  • পিত্তথলির পাথর নিরাময়ে  ইসবগুলের ভুষি
  • ওজন কমাতে ইসবগুলের ভুষি
  • ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ইসবগুলের ভুষি
  • হজমের সমস্যা দূর করতে ইসুবগুলের ভুষি
  • ত্বকের জন্য ইসবগুলের ভুসি
  • ইসবগুলের ভুষির পার্শপ্রতিক্রিয়া


ইসুবগুলের ভুষি কি ও এর উৎপত্তি

ইসুবগুলের ভুষি হল এক ধরনের বীজ থেকে প্রাপ্ত দ্রবনীয় ফাইবার। বীজ টার নাম হলো সাইলিয়াম। একটা গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে- এটা এক ধরনের রেচক হিসাবে পরিচিত, যা আমাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রতঙ্গ, হৃদপিণ্ড ও অগ্নাশয় এর বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। যদিও এটা এখন সারা বিশ্বের ছড়িয়ে  পড়েছে কিন্তু এটার আদি বাসস্থান ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোতে।

ভারত ,রাশিয়া, চীন, পাকিস্তানের সিন্ধু অঞ্চল, উত্তর আফ্রিকা এবং স্পেন এ  এটা চাষ করা হয়। এটার প্রায় ২০০ প্রজাতির মধ্যে দশটি প্রজাতি ভারতে পাওয়া যায়। ষোড়শ শতাব্দী তে ভারত উপমহাদেশে  প্রবেশ করে। অনেকেই বিশ্বাস করেন যে মোগল শাসনামলে ইসবগুলের ভুষি ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম চাষ শুরু হয়েছিল।

ইসুবগুলের ভুষি খাওয়ার নিয়ম

সাধারনত আমরা সবাই যেটা জানি তা হলো ইসবগুলের ভুষি দুই বা তিন চামচ একগ্লাস পানিতে রাতে ভিজিয়ে রেখে সকালবেলা শরবত বানিয়ে খেয়ে থাকি।  এটা ছাড়াও আরো অনেক নিয়ম রয়েছে। ২ বা ১ চামচ ইসবগুলের ভুসি এক গ্লাস পানিতে নিয়ে মিক্সড করে সাথে সাথে খেয়ে ফেলতে পারি যেন ইটা পেতে গিয়ে ফুলে উঠে। আপনি চাইলে চিনি ব্যবহার করতে পারেন, তবে না করায় ভালো।  আমরা অনেকেই দই এর সঙ্গে এই ভুসি খেয়ে থাকি। তবে মনে রাখা উচিত যে যদি আমাদের ডায়াবেটিক্স থাকে তাহলে কখনোই দই এর সঙ্গে ভুসি খাওয়া যাবেনা।

খালি পেটে ইসবগুলের ভুসি খেলে কি হয়

আমরা অনেকেই লম্বা সময় ধরে পেটের সমস্যায় ভুগে থাকি। লজ্জায় হয়তো কারো সাথে বিষয়টা নিয়ে আলাপ করতে পারিনা। এতে করে আমরা আরো বড় সমস্যা ডেকে আনছি। নিয়মিত সকালে খালি পেটে ইসবগুলের ভুষি খেলে বিভিন্ন ধরনের পেটের সমস্যা দূর হয়ে যায়। আমরা চেষ্টা করব সাথে সাথে ভিজিয়ে খেয়ে ফেলার জন্য। কারণ অনেকক্ষণ ধরে ভিজিয়ে রাখলে বাইরে থেকে এটা পানি শুষে নেবে ফলে এর কার্যকারিতা কমে যাবে। 

ইসুবগুলের ভুষির উপকারিতা

ইসুবগুলের ভুষির নানামুখী উপকারিতা রয়েছে। যদিও আমরা অনেকেই এটি শুধুমাত্র কুষ্ঠ কাঠিন্য রোগের জন্য ব্যবহার করে থাকি। এটা আমাদের দেহের অনেক উপকারী একটা উপাদান। এটার মধ্যে থাকা  ফাইবার আমাদের শরীরে বিভিন্নভাবে ক্রিয়া করে উপকার সাধন করে থাকে। নিচে ইসবগুলের ভুষির উপকার সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হলো। 

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে ইসবগুলের ভুষি

ইসুবগুলের ভুষি খাওয়ার ফলে যতগুলো উপকার পাওয়া যায় তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যায় কোষ্ঠকাঠিন্য রোগের বিরুদ্ধে। কারণ ইসুবগুলের ভুষির দ্রবণীয় ফাইবারের পানি দূষণের প্রকৃতির জন্যই আমাদের মল নরম হয়ে থাকে। ইসুবগুলের ভুষির অদ্রবণীয় ফাইবার আমাদের শরীরের মলের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। যার ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে থাকে।

তাই কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তির জন্য আপনাকে দৈনিক নিয়মিত এক গ্লাস কুসুম গরম পানি অথবা দুধের সাথে 2 চামচ ইসবগুলের ভুষি মিক্সড করে ঘুমানোর আগে পান করতে পারেন। এটা খুব ভাল করে ভিজিয়ে নিতে হবে। এটা ভালভাবে ভিজিয়ে রাখলে জল শোষণ করে এবং পেটে বাল্ক  ও নরম করতে সাহায্য করে।

মূত্রের সমস্যা দূর করতে ইসবগুলের ভুষি

আমাদের অনেকেই প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া করে। যাদের প্রস্রাবে এরকম জ্বালাপোড়া সমস্যা রয়েছে তারা নিয়মিত ইসুবগুলের ভুষি শরবতের সঙ্গে সকাল বিকাল পান করলে মূত্রের সমস্যা দূর হয়ে যায়। 

ওজন কমাতে ইসবগুলের ভুষি

ইসবগুলই ভুষির আরেকটি উপকারী গুণ হচ্ছে আমাদের শরীরের ওজন কমাতে অনেক কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। আমরা যদি আমাদের শরীরের ওজন কমাতে চাই তাহলে প্রতিদিন সকালে দুই চামচ ইসবগুলের ভুষি কুসুম গরম পানি ও সাথে অল্প পরিমাণ লেবুর রস মিশিয়ে খেতে হবে। আপনাকে এটা প্রতিদিন সকালের নাস্তার আগে পান করতে হবে অথবা খালি পেটে ঘুম থেকে উঠার পর চাইলেও পান করতে পারেন।

এটা আমাদের ওজন কমায় তবে খেয়াল রাখতে হবে এটা যেন ভালোভাবে ভিজিয়ে রাখা হয়। এটা আমাদের পাকস্থলীকে পরিষ্কার করতে সাহায্য করে সকল বর্জ্য পদার্থ বের করে দেওয়ার মাধ্যমে। এটার  শরবত রেগুলার খেলে আমাদের অন্য খাবার খাওয়ার ইচ্ছা অনেকাংশেই কমিয়ে দেয়। অর্থাৎ এটা আমাদের পেট কে ভরা রাখে। যার ফলে খুদা কম লাগে। 

পিত্তথলির পাথর নিরাময়ে  ইসবগুলের ভুষি

আমাদের অনেকেরই পিত্তথলীতে পাথর হয়ে থাকে। আমাদের এই পিত্তথলির পাথর নিরাময় করার জন্য প্রতিদিন এক গ্লাস গরম পানিতে এক চামচ ইসবগুলের ভুষি মিশিয়ে দিনে দুবার পান করুন।  পিত্তথলির পাথর নিরাময় না হওয়া পর্যন্ত বা পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত নিয়মিত এই পানীয়টি পান করতে থাকুন। খুব দ্রুতই পিত্তথলির পাথর নিরাময় হয়ে যাবে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ইসবগুলের ভুষি

আমাদের যাদের ডায়াবেটিস হয়েছে সেসব ব্যক্তিরাই জানেন যে জীবন কত কষ্টের।  যারা ডায়াবেটিস রোগে একবার আক্রান্ত হয় তাদের খাওয়া-দাওয়ায় অনেক রকম বাধা পড়ে।  কেননা যারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন তাদের ইনসুলিন এবং রক্তে শর্করার স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য নিয়মিত বজায় রাখার জন্য খাদ্যের প্রতি খুবই সচেতন হতে হয়। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে যে সাইলিয়ামের  মত ফাইবার গুলি মানুষকে স্বাস্থ্যকর গ্লাইসেমিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।

ইসুবগুলের ভুষি এটি পেটে জেলির মত পদার্থ তৈরি করে এবং গ্লুকোজের ভাঙ্গন এবং শোষণ ধীর করে দেয়। যার ফলে আমাদের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে। যাদের টাইপ ০২ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত তারা পাঁচগ্রাম ইসবগুলের ভুষি দিনে দুবার খেলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে অনেকাংশেই সহায়তা করতে পারে। সুতরাং আমরা যদি কেউ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে থাকি তবে ইসবগুলের ভুসি আমাদের জন্য উত্তম সমাধান হতে পারে। 

হজমের সমস্যা দূর করতে ইসুবগুলের ভুষি

আমাদের মাঝে অনেকেরই হজমের সমস্যা রয়েছে। আমাদের এই হজমের সমস্যা দূর করার জন্য আমরা  ইসুবগুলের  ভুসি খেতে পারি। সে ক্ষেত্রে এই ভুসি খাওয়ার নিয়ম হলো পানির সাথে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখতে হবে।  যাতে ভালোভাবে ভিজে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। খাওয়ার পর আমরা এই সিরাপটা খাব।  কিছুদিন খাওয়ার পরেই এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন। এটা হজমের সমস্যা দূর করে এর কারণ হচ্ছে ইসুবগুলের ভুষি আমাদের পেটের বর্জ্য দূর করে এবং হজম প্রক্রিয়াকে সহজতর করতে সাহায্য করে। 

ত্বকের জন্য ইসবগুলের ভুসি

আমাদের ত্বকের জন্য ইসবগুলের ভুষি খুবই কার্যকরী উপাদান। এটা আমাদের ত্বকের ক্ষতিকারক যেসব ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া রয়েছে তা দূর করতে সাহায্য করে। এবং এটা খাওয়ার ফলে আমাদের ত্বকের ব্রণের  মত বিভিন্ন চর্মরূপ থেকে দূরে রাখবে।

আমরা যদি ঘুমানোর আগে ইসবগুলের ভুষি এক গ্লাস পানির সাথে মধু মিশিয়ে  খেতে  পারি তাহলে আমাদের শরীর থেকে এটা টক্সিন বের করে দিবে এবং ত্বককে করে তুলবে উজ্জ্বল। আমাদের যদি কারো হাত পা জ্বালাপোড়া এবং মাথা ঘোরা থেকে থাকে তাহলে ইসুবগুলের ভুসি,আখ এর গুড়  এক সাথে মিশিয়ে সকাল বিকাল এক সপ্তাহ খেলে  অনেক উপকার পাওয়া যায়। 

ইসবগুলের ভুষির পার্শপ্রতিক্রিয়া

এটার অনেক অনেক গুণের মধ্যে কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া রয়েছে যেমন এটা দীর্ঘদিন ধরে খাওয়া যায় না। এতে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হতে পারে। এর জন্য আপনাকে কয়েকটি বিরতি দিয়ে ব্যবহার করতে হবে। ইসুবগুলের ভুষির বিভিন্ন ধরনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার মধ্যে অন্যতম হলো গ্যাস, ফুলা ভাব, ডায়রিয়া এবং কুষ্ঠ কাঠিন্য।  এটার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার মধ্যে আরেকটি হলো এটাতে এলার্জি ও দেখা যায় মাঝে মাঝে। 

যাদের খিঁচুনি রোগ রয়েছে বা গিলতে অসুবিধা হয় এবং পাচনতন্ত্রের কোথাও সংকীর্ণ বা বাধা যুক্ত থাকে তাদের এটা নেওয়া উচিত নয়। এবং যারা কিডনি রোগে আক্রান্ত এবং নির্দিষ্ট ওষুধ গ্রহণ করে থাকেন তারাও ইসবগুলের ভুষি গ্রহন করতে পারবেন না।  শিশুর ক্ষেত্রে যতক্ষণ পর্যন্ত স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী দ্বারা সুপারিশ না করা হয় ততক্ষন পর্যন্ত শিশুদের ইসুবগুলের ভুষি খাওয়ানো যাবে না। 

আমরা আমাদের বিভিন্ন ধরনের রোগের জন্য যেমন ডায়াবেটিস বা হৃদরোগ ইত্যাদির জন্য চিকিৎসা গ্রহণ করে থাকি।  এ সময় আপনি ইসবগুলের ভুষি খেতে পারবেন কিনা তা আপনার স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারীর  সাথে কথা বলে দেখুন। এছাড়া আমরা অনেকেই কিছু ঔষধ রেগুলার খেয়ে থাকি। আপনি ওষুধ সেবন করার সময় এটা খেতে পারবেন কিনা বা এটা খেলে কোন সমস্যা হবে কিনা তার জন্য অবশ্যই আপনি আপনার ডাক্তারের কাছ থেকে জেনে নিন। 

সবশেষে ইসবগুলের ভুষি আমাদের শরীরের জন্য যে কত উপকারী তা হয়তো আমরা উপরের লেখাটুকু থেকে জেনে গেছি। আশা করছি আপনাদের মনের সকল প্রশ্ন দূর হয়ে গেছে।  এখন থেকে আমরা এর সঠিক ব্যবহার করব এবং এর থেকে প্রাপ্ত উপকার গ্রহণ করব। 


Post a Comment

0 Comments