Ticker

6/recent/ticker-posts

বাচ্চাদের স্বাস্থ্য ভালো করার উপায়

 বাচ্চাদের স্বাস্থ্য ভালো করার উপায়



বাচ্চাদের স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা প্রতিটা অভিভাবক খুবই চিন্তায় থাকি। আমাদের আশেপাশে অনেক বাচ্চারই দেখা যায় ওজন ঠিক যতটা হওয়া উচিত ততটা হয় না। যার ফলে বাচ্চার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধীরে  ধীরে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। আমরা হয়তো খেয়াল করলে দেখে থাকবো যে অনেকের বাচ্চাকে বারবার খাওয়ানোর পরও তার ওজন বাড়ে না।


আবার কিছু কিছু বাচ্চা তো একদমই খেতেই চায় না। কিন্তু বয়স ও উচ্চতার সঙ্গে মিল রেখে বাচ্চাদের ওজন যথাযথ হওয়া যে কতটা জরুরি তা আমরা মোটামুটি সবাই জেনে থাকবো। কেননা বাচ্চাদের ওজন যদি কম থাকে তাহলে তাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধা প্রাপ্ত হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকবে।  আর ইমিউনিটি যদি কম থাকে তাহলে তো সেই বাচ্চা যে ঘন ঘন অসুখ-বিসুখে পড়বে  তা সবারই জানা কথা। 


সূচিপত্র :

  • বাচ্চাদের স্বাস্থ্য ভালো করার উপায়

  • বাচ্চা কেন স্বাস্থ্যবান হয় না 

  • বাচ্চার ওজন বাড়ানোর জন্য খাবার সমূহ 

  • বাচ্চার স্বাভাবিক বৃদ্ধির হিসাব 

  • অভ্যাস বদল



বাচ্চা কেন স্বাস্থ্যবান হয় না


আমাদের প্রায় প্রতিটি গার্জিয়ানেরই অভিযোগ থাকে যে আমরা শিশুকে সব ধরনের খাবার খাওয়ানোর পরও তাদের ওজন বা উচ্চতা কোনটাই বাড়ে না। কেন এরকমটা হচ্ছে ?আমাদের সবাইকে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে যে, জেনেটিকস বলে একটি বিষয় আছে। আমি শুধু এটা বলছি না যে জেনেটিক্স এর উপরেই বাচ্চাদের সবকিছু নির্ভর করে। আরো আমাদের চারপাশে অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলো শিশু ওজন ও উচ্চতা বাড়ার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।


আরো পড়ুন শিশুর পায়খানা না হলে করনীয়


তার মধ্যে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মা এবং মায়ের যত্ন।  মায়ের যত্ন  যেটা আমরা প্রায় প্রতিটি মানুষই একেবারেই ভুলে যাই। আমরা সবাই যে কাজটি করে থাকি যে; আমাদের সন্তান পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে তার যত্ন নিতে থাকে। এমনকি দেখা যায় কখনো কখনো তাদের অতিরিক্ত যত্নেই রাখি। এটা ভালো কথা। কিন্তু আমরা হয়তো অনেকেই জানিনা আমার সন্তানের যত্ন শুরু হওয়া উচিত ছিল যখন সে তার মায়ের গর্ভে ছিল তখন থেকে। কিন্তু আমরা যেটা করি সেটা হল শিশুর ছয় মাস হয়ে গেলে বুকের দুধ খাওয়ানোর পাশাপাশি  তাকে সব খাবার একেবারে দিয়ে একেবারে তাকে মোটা তাজা করতে চাই। দেখা যায় তার চাহিদা অনুযায়ী আমরা সব খাবার কিনে থাকি। এমনকি অনেকে দেখা যায় চাহিদার অতিরিক্ত  কিনে থাকে।


কিন্তু আমরা সবাই বাচ্চার মায়ের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে খুবই উদাসীন। অথচ মায়ের গর্ভধারণের সময় থেকে শিশুর যত্নের শুরু হওয়া উচিত ছিল। এমনকি তার অনেক আগে থেকেও। গর্ভকালের আগে শিশু যত্ন নেওয়া বিষয়টা শুনে হয়তো অনেকেই অবাক হচ্ছেন। অবাক হওয়ার কিছু নাই ,আমি সঠিক বলছি।  বাচ্চার মায়ের স্বাস্থ্য যদি ভালো না হয় তাহলে শিশু সুস্থ ও তার স্বাভাবিক বৃদ্ধি কিভাবে হবে ?অর্থাৎ একটা মা যদি সুস্থ ও স্বাভাবিক না থাকে তাহলে শিশু  কিভাবে সুস্থ ও স্বাভাবিক হবে।  আমাদের মনে রাখা উচিত একমাত্র একজন সুস্থ স্বাভাবিক মাই পারেন একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক শিশু জন্ম দিতে।  তাই আমাদের সবার আগে উচিত শিশুর মায়ের যত্ন নেওয়া। 


বাচ্চার ওজন বাড়ানোর জন্য খাবার সমূহ

আমরা প্রাপ্তবয়স্করা  চাইলে হয়তো একটু চেষ্টা করলেই আমরা নিজেদের ওজন খুব সহজেই বাড়াতে পারি।  কিন্তু বাচ্চাদের ক্ষেত্রে তাদের ওজন বাড়ানোর কথা হয়তো মুখে বলা খুব সহজ হলেও কাজে সেটা করে দেখানো এতটা সহজ নয়। কারণ আমাদের পাশে যেসব বাচ্চাদের ওজন কম তাদের সাধারণত খিদেই কম থাকে। যার ফলে তাদের খাওয়ানো খুবই কঠিন হয়ে পড়ে।

আরো পড়ুন শিশুদের জ্বর হলে করণীয়

তাছাড়া বাচ্চাদের নানা রকম ভাজাভুজি।,চকোলেট , জাঙ্ক ফুড ইত্যাদি খাবারের দিকে নজর থাকে।  হয়তো এসব খাবারের প্রচুর ক্যালরি রয়েছে কিন্তু পুষ্টিগুণ নেই বললেই চলে। তাই বাচ্চাদের ওজন বাড়ানোর জন্য তাদের খাবারে যথাযথ পুষ্টি থাকা জরুরী। আপনার বাচ্চার যদি ওজন কম থাকে তাহলে আপনি আপনার বাচ্চার প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় নিচের খাবার গুলো অবশ্যই রাখবেন। 


ডিম 

ডিম হলো একটি সম্পূর্ণ পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ খাবার। ডিমের ভিতরে সব ধরনের প্রোটিন এবং ভিটামিন রয়েছে। এছাড়া ডিমে রয়েছে একাধিক মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট। তাই  বাচ্চাদের স্বাস্থ্যকর ওজন  এর জন্য রোজ ডিম খাওয়ানো দরকার। আপনার বাচ্চার স্বাস্থ্য বাড়ানোর জন্য রোজ একটা করে খাওয়াতে পারেন। 


ডেয়ারি প্রোডাক্ট 

মাখন বা চিজ ,দুধ ইত্যাদি দুগ্ধ জাত খাবার অবশ্যই আপনার বাচ্চাকে খাওয়ান। যে সব শিশুরা বাড়ে তাদের জন্য ডেয়ারি প্রোডাক্ট খুবই দরকার। কেননা এর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম থাকায় আপনার সন্তানের শরীরের হাড়  অনেক শক্ত হবে। দুধ ও দুগ্ধ জাত খাবার আপনার শিশুর ওজন বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। 


আলু

আমাদের অনেকের বাচ্চাই সাধারণত আলু খেতে খুবই পছন্দ করে থাকে। আপনার বাচ্চা স্বাস্থ্যকর ভাবে ওজন বৃদ্ধির জন্য আলুর বিকল্প নেই। আলুর  মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালরি ,অ্যামাইনো এসিড এবং ডায়েটারি ফাইবার।  তাই যেকোনো বয়সের বাচ্চাকেই দৈনিক আলু  খাওয়ানো যেতে পারে। 


আরো পড়ুন নবজাতক শিশুদের ঠান্ডা লাগলে করণীয়


মাংস 

আপনি আপনার বাচ্চাকে দৈনিক মুরগির মাংস খাওয়াতে পারেন। কেননা মুরগির মাংসের মধ্যে থাকে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, যা আপনার বাচ্চার মাসল  তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বাচ্চাদের ওজন  বৃদ্ধির জন্য অন্যতম উপায় হলো তাকে দৈনিক মুরগির মাংস খাওয়ানো। 


কলা 

সাধারণত কলায় প্রচুর পরিমাণে এনার্জি থাকে। যে কারো ওজন বাড়ানোর জন্য কলা খুবই উপকারী উপাদান। সাধারণত একটা কলায় ১০৫ ক্যালোরি থাকে। আপনি আপনার বাচ্চাকে ফল ছাড়াও শেক  বা ডেজার্ট হিসেবে কলা খাওয়াতে পারেন। 


ঘি ও মাখন 

৮ থেকে ১০ মাস বয়সী বাচ্চাদের শরীরের শারীরিক গঠন এবং সাধারণ বৃদ্ধির জন্য মাখন খুবই কার্যকরী উপাদান। অল্প ঘি গরম ডাল অথবা খিচুড়ির উপর মেখে নিয়ে আপনার বাচ্চাকে খাওয়াতে পারেন। যেহেতু ঘি ও মাখন বাচ্চাদের দ্রুত ওজন ও চর্বি বৃদ্ধি করে থাকে তাই তাদেরকে বেশি পরিমাণে না দিয়ে অল্প পরিমাণে খাওয়ানো উচিত। 


ডাল 

প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ,পটাশিয়াম ,আয়রন ,ফাইবার ইত্যাদি ছাড়াও হরেক রকমের পুষ্টিতে সমৃদ্ধ খাবার হচ্ছে ডাল। আপনি আপনার শিশুকে ডাল খাওয়াতে পারেন। কেননা এটা ওজনবর্ধক তরল খাবার হিসেবে অভিহিত। আপনি চাইলে আপনার শিশুকে অল্প সবজি দিয়ে মিশ্র খিচুড়ি রান্না করে খাওয়াতে পারেন এটা শিশুর জন্য খুবই উপকারী। 


আরো পড়ুন শিশুর টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা


মিষ্টি আলু 

মিষ্টি আলু  শিশুর জন্য মুখরোচক  খাবার এবং এটা সহজ প্রাচ্য ও অধিক পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার। মিষ্টি আলু খুব সহজে সিদ্ধ করা যায়। মিষ্টি আলুতে রয়েছে  ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন বি-৬, ফসফরাস ,তামা, পটাশিয়াম ,ম্যাঙ্গানিজ ইত্যাদি যা শিশুর ওজন বৃদ্ধির জন্য আদর্শ উপাদানে পরিপূর্ণ। যেসব মিষ্টি আলু তন্তু সমৃদ্ধ সেই সব আলুকে সুস্বাদু চিপস  অথবা সবজি স্যুপ  করে আপনার শিশুকে দিতে পারেন এ ধরনের খাবার শিশুরা খেতে খুবই বেশি পছন্দ করে থাকে।


অভ্যাস বদল 

আমরা অনেকেই বাচ্চার খাওয়ার সময় টিভি চালু রাখি ,ভুলেও কখনো বাচ্চাদেরকে খাওয়ার সময় টিভি চালু রাখা যাবে না। ফাস্টফুড বাচ্চাদেরকে দেওয়া যাবে না এতে অধিক হারে ক্যালরি  বাড়ে। বাচ্চার স্বাস্থ্যের জন্য হেলথ ড্রিঙ্কস খুবই ক্ষতিকর এটা পরিহার করতে হবে। বাচ্চার জন্য লিকুইড খাবারের চেয়ে যেসব খাবার চিবিয়ে খাওয়া যায় সেসব খাবার খুবই উপকারী। কোন রোগা শিশুকে মোটা করতে যাবেন না।  


বাচ্চার স্বাভাবিক বৃদ্ধির হিসাব 

বাচ্চার কোন বয়সে কতটুকু ওজন বা উচ্চতা হওয়া উচিত তা সম্পর্কে আমরা অনেকেই অনভিজ্ঞ। তবে বাচ্চাদের ওজন বৃদ্ধির সাধারণ হিসাব আমাদের সবার জেনে রাখা ভালো। সাধারণত বাচ্চার বয়সের সাপেক্ষে তার ওজন জানতে বয়সের সাথে ৪ যোগ করুন এবং সেই যোগফল কে ২ দিয়ে গুণন করুন অর্থাৎ আমরা এভাবে বলতে পারি কারোর বয়স যদি ২ বছর হয় তাহলে তার ওজন হওয়া উচিত ১২ কেজি। 


সাধারণত একটি শিশু প্রথম বছরে তার উচ্চতা বাড়ে ৭৫সেন্টিমিটার  আর প্রতি চার বছরে বাচ্চার উচ্চতা বাড়ে ১০০ সেন্টিমিটার।  ৪ থেকে ১০ বছর বয়সীদের বছরে আনুমানিক উচ্চতা বৃদ্ধি পায় ৫ থেকে ১০ সেন্টিমিটার। 


পরিশেষে বাচ্চার স্বাস্থ্য যদি ভালো হয় তাহলে মা-বাবা এবং আমাদের আত্মীয়-স্বজনরা ভীষণ খুশি হয়। কিন্তু আমাদের একটা বিষয় মনে রাখা উচিত যে মোটা হয়ে যাওয়া আর স্বাস্থ্য ভালো থাকা দুটো এক বিষয় নয়। যেসব বাচ্চাদের ছোটবেলা থেকেই অনেক বেশি ওজন হয় তাদের এজমা ,টাইপ টু ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ইত্যাদির ঝুঁকি অনেকাংশেই বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া শিশু মোটা হওয়ার ফলে আমাদের সামাজিকভাবে হেও হবার বিষয়টি তো রয়েছে। তাই আমরা সব সময়  শিশুর স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন হব। 






Post a Comment

0 Comments