Ticker

6/recent/ticker-posts

গর্ভবতী মহিলাদের খাবার তালিকা



 গর্ভবতী মহিলাদের খাবার তালিকা

প্রতিটা দম্পত্তির জন্যই গর্ভকালীন সময়টি অত্যন্ত উত্তেজনাকর এবং আনন্দদায়ক। গর্ভকালীন সময়ে মা ও তার অনাগত শিশু দুজনারি অনেক বেশি যত্নের প্রয়োজন হয়ে থাকে। কেননা একজন সুস্থ মা  একটি সুস্থ স্বাভাবিক শিশুর জন্ম দিতে সক্ষম।  কোন মা যদি গর্ভকালীন সময়ে একটি  স্বাস্থ্যকর খাদ্য অভ্যাস গড়ে তুলে  তাহলে সুস্থ গর্ভধারণ এবং সুস্থ শিশুর জন্মদানের সম্ভাবনা অনেক বেশি বেড়ে যায়। তাই গর্ভাবস্থায় পুষ্টিকর খাবার খাওয়া মা ও শিশুর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 


আমাদের সমাজে একটি ভ্রান্ত ধারণা চালু রয়েছে গর্ভবতী মায়েদের খাবার সম্বন্ধে। এমনটি ধারণা করা হয় যে মা বেশি খেলে পেটের বাচ্চা অনেক বড় হয়ে যাবে। ফলে মায়ের স্বাভাবিক প্রসব হবে না এবং যার ফলে সিজারের প্রয়োজন পড়বে। আর এই ধারণার কারণে অনেক মায়েরাই অপুষ্টিতে ভুগেন এবং প্রসবের সময় নানা ধরনের জটিলতা দেখা যায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মা যদি যমজ সন্তান গর্ব ধারণ করে থাকে সেই ক্ষেত্রে তাদের খাবারের পরিমাণ বেশি দেয়া হয়।  এই ধারণাগুলো সম্পূর্ণই ভ্রান্ত ও অযৌক্তিক। 


চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক গর্ভবতী অবস্থায় একজন মা কি ধরনের খাবার খাওয়া উচিত এই বিষয়ে। 



গর্ভবতী অবস্থায় যে খাবারগুলো খাওয়া উচিত


ফল ও শাকসবজি দিনে কমপক্ষে পাঁচ বার ফল ও সাতবার সবজি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। তবে শাকসবজি একটু বেশি বেশি খাবেন।  বিভিন্ন ধরণের জুস পান করতে পারেন ,তবে এক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হলো এগুলো সুগার ব্লাড এবং সুগার লেভেল বৃদ্ধি করতে পারে সাথে দাঁতের ক্ষতি করতে পারে। তাই বিভিন্ন ধরনের জুস সীমিত পরিমানে পান করায় ভালো। তার পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের তাজা ফল ও সবজি বেশি খাওয়ায় স্বাস্থ্যকর। 


প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার মুরগি, মাছ ,ডিম, ডাল, চর্বিহীন মাংস ইত্যাদি প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার অভ্যাস করুন। এই সময় সপ্তাহে কমপক্ষে ২ দিন বা তার চেয়েও বেশি মাছ খেতে পারেন। তবে যেসব সামুদ্রিক মাছ যেমন সার্ডিন , স্যামন  এরকম তৈলাক্ত মাছ সপ্তাহে একদিন খেতে পারেন। শিশুর শরীরের নতুন টিস্যু গঠনের জন্য আমিষ  জাতীয় খাবার খুবই সহায়তা করে থাকে। 


দুগ্ধ জাত খাবার ক্যালসিয়ামের চমৎকার উৎস হিসেবে বলা যায়। এগুলো চিনি ও ফ্যাটের পরিমাণ যেন কম থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে । শিশুর মস্তিষ্কের কোষ গঠনের জন্য ফ্যাট জাতীয় খাবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। অনেক  মানুষের শরীরেই অনেক সময় আয়োডিনের ঘাটতি দেখা যায়। এটি এমন একটি খনিজ উপাদান যা শিশুর মস্তিষ্ক গঠনের জন্য অনেক বেশি কার্যকরী। আয়োডিনের চমৎকার উৎস হলো দুগ্ধ জাত খাবার ও সামুদ্রিক খাবার। 


স্টার্চ জাতীয় খাবার আলু, রুটি ,পাস্তা, লাল চালের ভাত ইত্যাদি খাবার অবশ্যই আপনার দৈনিক খাদ্য তালিকায় রাখার চেষ্টা করুন।  এইসব শর্করা জাতীয় খাবার শরীরে প্রচুর পরিমাণে এনার্জি প্রদান করে থাকে। যা আপনার জন্য খুবই উপকারী। 


এক মাস থেকে তিন মাস গর্ভবতী মায়ের  খাবার তালিকা


গর্ভকালীন সময়ে সাধারণত প্রথম তিন মাস তেমন বেশি একটা খাবারের প্রয়োজন পড়ে না। এ সময় খাবারের তালিকায় ক্যালোরির চাহিদাটা নির্ভর করে আপনার উচ্চতা ,ওজন ও দৈনন্দিন শারীরিক পরিশ্রমের উপর। এই সময় যদি আপনার ওজন বাড়তে থাকে তাহলে সেই অনুযায়ী খাবারের পরিমাণটা একটু কমিয়ে দিতে হবে এবং সাথে ব্যায়ামের পরিমাণ বাড়িয়ে স্বাভাবিক ওজনে আসার চেষ্টা করতে হবে।


আবার যদি এই সময় ওজন কমতে থাকে তাহলে ব্যায়ামটা স্বাভাবিক রেখে খাবারের পরিমাণটা কিছুটা বাড়িয়ে দিতে হবে। প্রয়োজনে আপনি এসব বিষয়ের জন্য একজন রেজিস্টার্ড ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নিতে পারেন। তিনি আপনার জন্য একটি খাবার তালিকা প্রস্তুত করতে সহায়তা করতে পারেন। 


আপনি এই সময় বিভিন্ন ধরনের খাবার যেমন ভাত , সবুজ ও রঙিন অথবা কমলা ফল ও সবজি, ডিম, দুধ ,মাছ ,মাংস ইত্যাদি খেতে পারেন। তবে খেয়াল রাখবেন খাবারগুলো তো যেন রান্না করার সময় সীমিত পরিমানে তেল ব্যবহার করা হয়। অতিরিক্ত তেল আপনার খাবারের পুষ্টিগুণ তেমন একটা বাড়াবে না তবে কিছুটা ক্যালোরি বাড়িয়ে দেয়। 


০৪ মাস থেকে ০৯ মাস গর্ভবতী মায়ের  খাবার তালিকা


যখন গর্বের শিশু বেড়ে ওঠে সাথে সাথে গর্ভবতী মায়ের খাবারের চাহিদাও ধীরে ধীরে কিছুটা বাড়তে থাকে। তাই গর্ব ধারনের পর প্রথম তিন মাসের চেয়ে খাওয়া-দাওয়ার পরিমাণ এই সময় কিছুটা বাড়াতে হবে।


একজন স্বাভাবিক ওজনের মায়ের জন্য চার মাস থেকে ছয় মাসের গর্ভবতীর প্রথম তিন মাস সে যে পরিমাণ ক্যালরি গ্রহণ করেছেন তার চেয়ে অতিরিক্ত প্রতিদিন ৩৪০ ক্যালোরি খাবার খাওয়া প্রয়োজন। আবার অপরদিকে একজন স্বাভাবিক ওজনের ৭ থেকে ৯ মাসের গর্ভবতী মায়ের জন্য প্রতিদিন অতিরিক্ত কমপক্ষে ৪৫০ ক্যালোরি খাবার খেতে হবে।


তবে সেই ক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হলো ওজন যদি একটু বেশি হয় তাহলে কিছুটা কম পরিমাণে অতিরিক্ত খাবার খাওয়া যেতে পারে। তবে এই বিষয়ে সবচেয়ে ভালো হয় ডাক্তারের কাছ থেকে বিস্তারিত পরামর্শ নেওয়া।


এসব অতিরিক্ত খাবারের চাহিদা পূরণ করার জন্য প্রতিদিন তিন বেলা খাবার গ্রহণের পাশাপাশি দিনে কমপক্ষে আরো দুইবার হালকা খাবার খাওয়ার যেতে পারে। হালকা খাবারটি হতে পারে একটি ফল অথবা পাঁচ ছয়টি বাদাম ,আধা কাপ টক দই। তাছাড়া ক্ষুধা লাগলে আপনি যেকোনো সময় পরিমাণ মতো স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে পারেন।


তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে আপনার গর্ভে যদি জমজ সন্তান থাকে তাহলে যে অনেক বেশি খাবার খেতে হবে, আসলে বিষয়টা এরকম নয়। সাধারণত গর্ভে যদি ২ জন শিশু থাকে তাহলে হিসাব মতে দৈনিক প্রায় অতিরিক্ত  ৬০০ ক্যালোরি  সমান বাড়তি খাবার খাওয়া প্রয়োজন। আর যদি  তিনটি সন্তান গর্ভধারণ করে থাকে তাহলে দৈনিক অতিরিক্ত ৯০০ ক্যালোরি খাবার গ্রহণ করলেই হয়ে যাবে। 


গর্ভবতী অবস্থায় যে খাবারগুলো খাওয়া উচিত নয়


কাঁচা ডিম ডিম আমাদের জন্য খুবই পুষ্টিকর খাবার। অনেকের দেখা যায় কাঁচা ডিম খাওয়ার একটা অভ্যাস থাকে। গর্ভাবস্থায় এই কাঁচা ডিম খাওয়া থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। সালমোনেলা নামক ব্যাকটেরিয়া কাঁচা ডিমের ভিতরে থাকে। তাই এই ব্যাকটেরিয়া থেকে বাঁচার জন্য ডিম ভালোভাবে সিদ্ধ করে খেতে হবে। 


অর্ধ সিদ্ধ মাংস অর্ধ সিদ্ধ মাংসে  থাকে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া। তাই অর্ধ সিদ্ধ মাংস এবং প্যাকেটজাত মাংস খাওয়া থেকেও গর্ভবতী মায়েদের  বিরত থাকতে হবে। আর মাংস অবশ্যই খুব ভালোভাবে সিদ্ধ করে রান্না করতে হবে। 


অপাস্তরিত দুগ্ধ বা কাঁচা দুধ অপাস্তরিত দুগ্ধ বা কাঁচা দুধের মাঝে ব্যাকটেরিয়া থাকে।  তাই দুধ খাওয়ার আগে অবশ্যই এটা ভালো করে ফুটিয়ে নিতে হবে। কাঁচা দুধ দিয়ে তৈরি খাবার যেমন নরম পনির এই ধরনের খাবার খাওয়া থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। 


কাঁচা বা আধা পাকা পেঁপে গর্ভবতী মহিলাদের জন্য কাঁচা বা আধাপাকা  পেঁপে খাওয়া বিপদের কারণ হতে পারে। কারণ এতে গর্ভপাতের মতো ঘটনা অনেক সময় ঘটে যায়। তাই এই খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। 


ক্যাফেইন কফি আমাদের শরীরের ক্লান্তি দূর করার জন্য কার্যকর হলেও একজন গর্ভবতী মহিলার জন্য এটার পরিমাণ কমাতে হবে। কেননা চা কফিতে ক্যাফেইন থাকে। দৈনিক ২০০ গ্রাম এর বেশি ক্যাফেইন  কখনোই গ্রহণ করা উচিত নয়। অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণের ফলে অনেক সময় কম ওজনের শিশু জন্ম নিতে পারে।  এমনকি অনেক সময় মিসক্যারেজের মতো ঘটনা ঘটে যায়। 


কলিজা তৈরি খাবার কলিজাতে রেটিনাল থাকে যা একটি প্রাণী  ভিটামিন। কলিজা অতিরিক্ত খাওয়ার ফেলে গর্ভের শিশুর জন্য ক্ষতিকর দিক হতে পারে। 


বিভিন্ন সময়ানুযায়ী গর্ভবতী মায়ের খাবার তালিকা 


এখানে আমরা কিছু আদর্শ খাবারের রুটিনের কথা বলেছি। তবে আপনি আপনার বয়স ,শারীরিক অবস্থা, ওজন ইত্যাদি বিষয়ের উপর বিবেচনা করে আপনার ডাক্তারের কাছ থেকে সাজেশন নিবেন। 


সকাল সকালে গর্ভবতী মহিলাদের মাঝে মাঝেই বমি বমি ভাব হয় এবং কিছু খেতে ইচ্ছা করে না। তাই এই সময় ভারী খাবার না খেয়ে হালকা চা ও বিস্কিট খাওয়া যেতে পারে। এর কিছুক্ষণ পরেই দুইটি রুটি ও সবজি খেতে পারেন এবং সাথে একটি সিদ্ধ ডিম নিতে পারেন। বেলা দশটা অথবা এগারোটার দিকে এক গ্লাস দুধ অথবা ফলের জুস কিংবা বাদামো খেতে পারে। 


দুপুর দুপুরে খাবার সময় আপনি এক বাটি ভাত সাথে সবজির তরকারি ,শাক , ডাল ,মাছ অথবা মাংস এবং সবজির সালাত খেতে পারেন ,এবং খাওয়ার পরে আপনি ইচ্ছে করলে দই নিতে পারেন।


বিকেল আমাদের বিকেলে অনেকেরই ভাজাপোড়া খাবার অভ্যাস রয়েছে। তবে গর্ভবতী অবস্থায় ভাজাপোড়া না খেয়ে আপনি ঘরের তৈরি বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যকর স্নাক্স ,কেক ,বাদাম কিংবা মটরশুঁটি খেতে পারেন এবং ইচ্ছে করলে এক গ্লাস ফলের জুস খেতে পারেন। যা আপনার জন্য খুবই উপকারী। 


রাত রাতে খাবার সাধারণত দুপুরের মতো হলেই চলবে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো শাক  রাতের বেলা না খাওয়াই ভালো। এ সময় আপনি বেশি করে সবজি খেতে পারেন। মনে রাখার বিষয় হচ্ছে ঘুমোতে যাওয়ার আগে এক গ্লাস ননী মুক্ত দুধ পান করতে কখনোই ভুলবেন না। 



পরিশেষে গর্ভবতী মায়েদের যতটুকু সম্ভব বাড়ির তৈরি খাবার খেতে হবে এবং সুস্থ খাবার খেতে হবে। যার ফলে আমাদের গর্ভবতী মায়েদের শরীর ভালো থাকবে ,আর গর্ভবতী মায়ের শরীর ভালো থাকলে তার ভিতরে থাকা সন্তানও ভালো থাকবে। আর যদি গর্ব অবস্থায় মা অপুষ্টিতে ভুগে তাহলে এর প্রভাব মা ও সন্তান দুজনের উপরেই সমানভাবে পড়বে। তাই গর্ভে থাকা সন্তানের শারীরিক ও মানসিক বিকাশসহ নিরাপদ মাতৃত্ব  নিশ্চিতকরণের জন্য গর্ভবতী প্রতিটি মায়ের সঠিক খাদ্যবাস মেনে চলার বিকল্প নেই। 




Post a Comment

0 Comments