Ticker

6/recent/ticker-posts

শিশুদের জ্বর হলে করণীয়



 শিশুদের জ্বর হলে করণীয়

আমাদের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা আমাদের বয়স স্বাস্থ্য ,দৈনন্দিন ক্রিয়া-কলাপ, এবং দিনের যে সময় আছে তার সাথে পরিবর্তিত হয়। সাধারণত শিশু বাচ্চাদের শরীরের তাপমাত্রা বড়দের চেয়ে একটু বেশি হয়ে থাকে। আমাদের শরীরের তাপমাত্রা বিকাল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে সর্বোচ্চ থাকে আর  শরীরের তাপমাত্রা সাধারণত  মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত সর্বনিম্ন থাকে। 


আমাদের প্রতিটি সন্তানি বাবা-মায়ের চোখের মনি ,তাদের নারী ছেড়া ধন। বিশেষ করে মায়ের কাছে প্রতিটি সন্তানি অনেক মূল্যবান এবং অনেক বেশি আদরের। আর যখন এই আদরের সন্তান অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন মা সবচেয়ে বেশি অস্থির হয়ে যায়। আর সেটা যদি হয় সদ্য জন্ম গ্রহণ করা কোন শিশু তবে সেই ক্ষেত্রে চিন্তা আরও অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়। সাধারণত শরীরের ভেতর যখন কোন ইনফেকশন দেখা দেয় তখনই কেবলমাত্র শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় ,যাকে আমরা  জ্বর বলে থাকি। 


আমাদের অনেক অভিভাবকই  আছে যারা বুঝতে পারে না সাধারণত শিশুদের কেন বারবার জ্বর বা ঠান্ডা লাগছে। যখন একজন শিশু পৃথিবীতে আসে তখন প্রথম প্রথম কিছু সমস্যা দেখা দেওয়াটাই একটা নবজাতক শিশুর জন্য স্বাভাবিক ব্যাপার। কেননা মায়ের গর্ভের যে তাপমাত্রা এবং পরিবেশের সাথে বাইরের যে তাপমাত্রা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অবস্থা। আর এই সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে শিশু অনেকটা সময় লেগে যায়। আর এই খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে এই নবজাতক শিশুকে পড়তে হয় নানা ধরনের সমস্যা। 


শিশুদের জ্বর আসার কারণ


জ্বর এটা আসলে কোন অসুখ  নয় বরং কেবলমাত্র অসুখের উপসর্গ। আর শিশুদের অসুখের প্রধান উপসর্গ হচ্ছে জ্বর। জ্বর কিন্তু সর্বদাই ক্ষতিকর নয়। আমাদের সবার জানা উচিত শিশুদের কোন অসুখে পড়লে শরীর রোগের বিরুদ্ধে জ্বর উপসর্গের মাধ্যমে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। সেজন্য অল্প মাত্রার জ্বর কখনো কোন ক্ষতি সাধন করে না ,বরং সেটা শরীরের জন্য উপকারী। এই কারণে  অল্প মাত্রার জ্বরের জন্য ওষুধের প্রয়োজন হয় না। 


শিশুদের জ্বরের বেশ কিছু কারণ এর মধ্যে অন্যতম কারণ হচ্ছে নানা ধরনের সংক্রমণ। শিশুরা সাধারণত ইনফ্লুয়েঞ্জা ,আমাশয় থেকে শুরু করে হাম, বসন্ত আরও জটিল কোন সংক্রমনের প্রথম লক্ষণ হলো জ্বর। তাই জ্বর কে অবহেলা করা উচিত নয়। বিভিন্ন কারণে সাধারণত নবজাতক শিশুদের জ্বর হয়ে থাকে। যেমন ব্যাকটেরিয়া   ও ভাইরাসের কারণে শরীরের কোন সংক্রমণ যদি দেখা দেয় ,অনেক সময় টিকা দেওয়ার ফলেও নবজাতক শিশুদের জ্বর হতে পারে। 


আর শিশুদের শরীরে হাত দিয়ে জ্বর বুঝা খুবই কঠিন ব্যাপার। কেননা শিশুদের শরীর সব সময় ঢাকা থাকে ,আর শরীর ঢাকা থাকার কারণে শরীর সবসময় গরম থাকে। তাই শিশুদের জ্বর না থাকা সত্তেও গরম থাকার কারণে জ্বর আছে বলে ভুল হতে পারে। সেক্ষেত্রে শিশুদের বগলের নিচে থার্মোমিটার দিয়ে তিন থেকে পাঁচ মিনিট রাখার পর যদি শিশুদের দেহের তাপমাত্রা ৯৯ ডিগ্রী ফারেনহাইট এর বেশি পাওয়া যায় সে ক্ষেত্রে ধরে নিতে হবে শিশুর জ্বর রয়েছে। 


যেসব লক্ষণ দেখে বুঝবেন শিশুর জ্বর এসেছে


বিভিন্ন লক্ষণ দেখে আপনাকে বুঝে নিতে হবে আপনার শিশুর শরীরে জ্বর আছে কিনা ?যেমন যদি আপনার শিশু নিস্তেজ হয়ে পড়ে কিংবা ঘুম ঘুম ভাব থাকে ,শরীরে যদি খিঁচুনি  দেয় সে ক্ষেত্রে আপনাকে বুঝে নিতে হবে তার জ্বর হওয়া সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া  শিশুর মাথার তালু খুব ফুলে যাওয়া, সারাক্ষণ কান্না করতে থাকা, বারবার বমি হওয়া বা পাতলা পায়খানা করা ,শিশু কিছু খেতে না চাওয়া ,আপনার শিশুর শরীর ফেকাশে হয়ে পড়া, শিশু যদি ঘন ঘন শ্বাস নেয় অথবা শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা দেখা দেয়,  শরীরের দানা দানা দাগ অথবা গায়ে ফুসকুড়ি উঠে এবং লম্বা সময় ধরে অর্থাৎ ১২ ঘণ্টার মধ্যে যদি কোন প্রস্রাব না হয় তাহলে আপনাকে বুঝে নিতে হবে আপনার শিশুর দেহে জ্বর হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। 


নবজাতক শিশুর জ্বর হলে করণীয়


থার্মোমিটার এর সাহায্যে জ্বর মাপা আপনার শিশুর জ্বর আছে কিনা তা সর্বপ্রথম থার্মোমিটারের সাহায্যে নিশ্চিত হয়ে নিবেন। যদি জ্বর থাকে তাহলে কয়েক ঘণ্টা পরপর থার্মোমিটারের সাহায্যে জ্বর মেপে সেটা লিখে রাখতে হবে। আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে যে জ্বর উঠানামা করছে কিনা ?তাহলে এটা দেখে ডাক্তার খুব সহজেই জ্বরের ধরন সম্পর্কে বুঝতে পারবে ,সে মোতাবেক ডাক্তার আপনার শিশুর জন্য সঠিক প্রেসক্রিপশন করতে পারবে। যাদের ঘরে ছোট শিশু রয়েছে তাদের ঘরে অবশ্যই থার্মোমিটার থাকা উচিত। আজকাল আমাদের আশেপাশের দোকানে অনেক ভালো মানের ডিজিটাল থার্মোমিটার পাওয়া যায় যেখানে সবকিছু স্পষ্ট ভাবে বোঝা ও পড়া যায়। 


জ্বরের সময় গা মুছে দেওয়া জ্বর যদি খুব বেশি বেড়ে যায় তাহলে পরিষ্কার তোয়ালে ,গামছা অথবা সুতি বড় ওড়না দিয়ে কুসুম গরম পানি এর মধ্যে ভিজিয়ে নিতে হবে। তারপর ভেজা তোয়ালে বা কাপড় পানি চিপে নিয়ে সর্বপ্রথম শিশুর এক হাত তারপর অন্য হাত পড়ে শরীর দুই পা বিশেষ করে বগল ও কুঁচকি ভালো করে মুছে দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মোছার পরপরই শুকনা কাপড় দিয়ে তা মুছে ফেলতে হবে। শরীর যেন কোনভাবেই বেশিক্ষণ ভেজা না থাকে। এরকম ভাবে জ্বর না কমা পর্যন্ত বারবার সমস্ত শরীর মুছে দিতে হবে। 


ঘরোয়া পরিচর্যা শিশু যে ঘরে থাকে সে ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক করে তোলার চেষ্টা করুন। ঘরের তাপমাত্রা যদি ১৮ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে হয় তাহলে সেটা সবচেয়ে ভালো। আপনার ঘরের জানালাগুলো খুলে রাখুন, যেন যথেষ্ট আলো বাতাস ঘরে প্রবেশ করতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। প্রয়োজনে ফ্যান ছেড়ে দিন ,অতিরিক্ত যেসব কাপড়চোপড়,কাঁথা বা চাদর রয়েছে সেগুলোর প্রয়োজন নেই। কোন ভাবেই মাথা ঢেকে রাখা যাবে না। কারণ মাথা থেকেই তাপ সব চেয়ে বেশি নির্গত হয়। আর জ্বর ছাড়ার জন্য তাপ নির্গত হওয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। 


জ্বরে শিশুর খাবার যদি আপনার শিশুর জ্বর হয় তাহলে মায়ের বুকের দুধ কখনই বন্ধ করা চলবে না। আপনার শিশুকে ঘন ঘন বুকের দুধ খাওয়ান। কেননা বুকের দুধ না খেলে শিশু দুর্বল হয়ে পড়ে ,আর শিশু যেন দুর্বল হয়ে না পড়ে সেই জন্য ঘন ঘন মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। স্বাভাবিক তরল খাবার, ফলের রস ও প্রচুর পরিমাণে পানি পান করাতে পারেন ,এতে করে শরীর পানি শূন্য হবে না। 


সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ নবজাতকের যদি জ্বর হয় তাকে সবসময় পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়। যদি আপনার শিশুর জ্বর একদম না কমে অথবা জ্বর বাড়তে থাকে কিংবা শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্ট ও বমি বা পায়খানা অনেক বেশি হয় ,তাহলে অতিসত্বর ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। আর এই সময়টাতে মায়ের কাছাকাছি শিশুর জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কেননা শিশু যদি মায়ের আশ্রয় থাকে তাহলে সে নির্ভরতা পায়, নিজেকে নিরাপদ মনে করে থাকে। 


জ্বরের শিশুকে ডাক্তার দেখানো জ্বরের কিছু পরিচিত লক্ষণ যেমন গায়ে হাম ,পাতলা পায়খানা ,চোখ হলুদ হওয়া ,প্রস্রাব না হওয়া ,খুব কাশি, শ্বাসকষ্ট,গলা ব্যথা, কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা ,ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়া ইত্যাদি যদি আপনার শিশুর মাঝে দেখা যায় তাহলে দ্রুত একজন শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যেতে হবে। মনে রাখবেন শিশুকে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনক্রমে জ্বর কমানোর জন্য কোন ধরনের ঔষধ খাওয়ানো উচিত নয়। আপনি শিশু ডাক্তারের কাছে জ্বরের লক্ষণগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে বলুন, এতে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন করার জন্য অনেক সুবিধা হবে। আপনার শিশুর জ্বর হলে কিভাবে তার যত্ন নিতে হবে ,কিভাবে শিশুর সেবা করতে হবে তার জন্য অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শই সবচেয়ে ভালো। ডাক্তারের দেওয়া প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সঠিক সময়ে শিশুকে পথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। 


পরিশিষ্ট

শিশুদের প্রায়ই জ্বর হয়ে থাকে ,যা মা বাবা বা অভিভাবককে দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। বিশেষ করে মা-বাবা শিশুর জ্বরে  অনেক বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশুর জ্বর সাধারণত সর্দি বা কাশি থেকে তৈরি হয়। আগেই বলা হয়েছে জ্বর কোন অসুখ নয় ,এটা কেবল অসুখের উপসর্গ মাত্র। তাই আমাদের সবার উচিত যদি শিশুর জ্বর হয় তাহলে তার জ্বর নিবারণের পাশাপাশি জ্বরের আসল কারণ খুঁজে বের করা। সেজন্য শিশুর জ্বর হলে ভয় না পায়ে তাৎক্ষণিক কিছু ব্যবস্থা নিন এবং তার সেবা ও পরিচর্যা করুন। আপনার সঠিক পরিচর্যা ও যত্নই পারে আপনার শিশুকে সুস্থ করে তুলতে। 



Post a Comment

0 Comments