Ticker

6/recent/ticker-posts

টাইফয়েড হলে করণীয়



টাইফয়েড হলে করণীয়


টাইফয়েড জ্বর হলো এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া গঠিত রোগ, যা সালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়ে থাকে। এটা লক্ষণ মৃদু থেকে তীব্রতর  হতে পারে। সাধারণত এটা লক্ষণ জীবাণু প্রবেশের ৬ থেকে ৩০দিন পর দেখা যায়। টাইফয়েড জ্বর হলে প্রাথমিকভাবে প্রায় কয়েকদিনের ব্যবধানে জ্বরের তীব্রতা অনেক বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া দুর্বলতা, পেট ব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং মাথাব্যথা হতে দেখা যায়। তবে টাইফয়েড হলে খুব বেশি একটা ডায়রিয়া হতে দেখা যায় না।


টাইফয়েড জ্বর হলে কিছু কিছু মানুষের শরীরে রেশের সাথে গোলাপি স্পট দেখা যায়। যদি এর সঠিক চিকিৎসা না নেয়া হয় তবে টাইফয়েড সপ্তাহ বা মাসখানেক ধরে লক্ষণ থাকতে পারে। আবার কিছু কিছু ব্যক্তি দেখা যায় আক্রান্ত না হয়েও টাইফয়েডের জীবাণু বহন করে এই রোগের বিস্তার ঘটাতে পারে। টাইফয়েড জ্বর এন্টিবায়োটিক গ্রহণের মাধ্যমে  সারানো যেতে পারে। 


বাংলাদেশে টাইফয়েড জ্বর খুবই একটি প্রচলিত রোগ। সাধারণত এটা দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে মানুষের দেহে জীবাণু ছড়িয়ে  থাকে। তবে যেসব এলাকায় ঘনবসতিপূর্ণ লোকজন এর বসবাস তাদের টাইফয়েড জ্বরের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। 


যেসব ব্যক্তি টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত তাদের রক্ত স্রোতে এবং অন্ত্রনালীতে এই ব্যাকটেরিয়া অবস্থান করে থাকে। দূষিত খাবার ও পানি গ্রহণের ফলে এই ব্যাকটেরিয়া মানুষের দেহে প্রবেশ করার মাধ্যমে এর জীবাণু  গুলোকে গুণিতক আকারে বেড়ে গিয়ে রক্ত স্রোতে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে দেখা দেয় জ্বর সহ নানা ধরনের উপসর্গ। আজ আমরা আমাদের এই ব্লগে জানবো টাইফয়েড জ্বর হওয়ার কারণ লক্ষণ চিকিৎসা ও প্রতিকার সম্পর্কে। 


সূচিপত্র :

  • টাইফয়েড হলে করণীয়
  • টাইফয়েড জ্বর হওয়ার কারণ ও ছড়ানোর মাধ্যম
  • টাইফয়েড জ্বর কাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ
  • টাইফয়েড রোগ  বুঝার উপায়
  • টাইফয়েড শরীরের কোন অংশে আক্রমণ করে
  • টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ গুলো কি কি
  • টাইফয়েড জ্বরের চিকিৎসা
  • টাইফয়েড জ্বরের প্রতিরোধে করণীয় সমূহ


টাইফয়েড জ্বর হওয়ার কারণ ও ছড়ানোর মাধ্যম


টাইফয়েড জ্বর এটি একটি পানিবাহিত রোগ।  যা সাধারণত দুই ধরনের জীবাণুর সংক্রমণে হয়ে থাকে। জীবাণুগুলো হল ‘সালমোনেলা টাইফি’ও ‘সালমোনেলা প্যারাটাইফি’। সালমোনেলা টাইফি এর সংক্রমণে যে জ্বর হয়ে থাকে তাকে বলা হয় টাইফয়েড জ্বর বা এন্টানিক ফিভার। আর যদি জ্বর সালমোনেলা প্যারাটাইফি এই জীবাণুর সংস্পর্শের কারণে হয়ে থাকে তখন আমরা এটাকে বলি প্যারা টাইফয়েড জ্বর।


প্রধানত দূষিত পানি ও খাবার গ্রহণের মাধ্যমে এই জীবাণু আমাদের মানব দেহের ভিতরে প্রবেশ করে থাকে। আবার অনেক ক্ষেত্রে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার প্রতি অবহেলার কারণেও এটি মানব শরীরে প্রবেশ করতে পারে। অনেক সময় টাইফয়েড আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হওয়ার পরও এই জীবাণুর বাহক হতে পারে।  যেভাবেই এই টাইফয়েড জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে থাক না কেন এটা শরীরের প্রবেশ করার পর তা বৃহদন্ত্রকে আক্রমণ করে। এছাড়াও এই টাইফয়েড এর ব্যাকটেরিয়া আমাদের শরীরে পিত্ত থলিতে  জমা থাকে এবং যখন উপযুক্ত পরিবেশ পায় তখনই কেবল আক্রমণ করে থাকে।


টাইফয়েড জ্বর কাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ


সাধারণত টাইফয়েড জ্বর যে কোন বয়সের মানুষেরই হতে পারে ,তবে শিশুদের ক্ষেত্রে একটু বেশি হওয়ার প্রবল সম্ভবনা  থাকে। আমাদের শরীরে জীবাণু প্রবেশ করা মাত্রই যে টাইফয়েডে আক্রান্ত হবে এরকম কোন যৌক্তিকতা নেই। কেননা দেহে যদি আমাদের রোগ  প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকে ,তাহলে এই জীবাণু আমাদের দেহে সংক্রমণ করতে পারে না।

তবে যে সব ব্যক্তি কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন যেমন এইচ আই বি পজেটিভ ও এইডস  রোগীরা খুব সহজেই টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হতে পারে। আর তাছাড়া যেসব এলাকায় এই রোগের বিস্তার রয়েছে সেসব এলাকায় ভ্রমণ করলেও এই রোগের জীবাণু দ্বারা আক্রমণিত হওয়ার অনেক বেশি সম্ভাবনা থাকে। 



টাইফয়েড রোগ  বুঝার উপায়


টাইফয়েড রোগ এটা নির্ণয় করা বেশ কঠিন ব্যাপার। তবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর কেবলমাত্র  চিকিৎসকগণই বলতে পারেন এটা টাইফয়েড রোগ কিনা। দ্রুত সনাক্ত করার জন্য ব্লাড কালচার নামক এক ধরনের নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। যদি নমুনায় স্যালমোনেলা নামক ব্যাকটেরিয়া লক্ষণ পাওয়া যায় তাহলে প্রকারভেদে টাইফয়েড এর পার্থক্য করা হয়।


টাইফয়েড জ্বর পরীক্ষা করার আরেকটি পদ্ধতি হলো দ্বিতীয় সপ্তাহে উইডাল  টেস্ট নামে এক ধরনের নন স্পেসিফিক ব্লাড টেস্ট যেখানে টাইটার  দেখে নির্ধারণ করা হয় টাইফয়েড জ্বর হয়েছে কিনা। এছাড়াও টাইফয়েড ভিডাল  টেস্ট করা তবে ভিডাল টেস্ট কোন নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা নয়। পায়খানা প্রস্রাব কালচার করে নিয়মিত ওষুধের মাধ্যমে জীবাণু আলাদা করা যায়। 


টাইফয়েড শরীরের কোন অংশে আক্রমণ করে


টাইফয়েড জ্বর শুধুমাত্র শরীরের নির্দিষ্ট কোন অংশেই আক্রমণ করে না। এটা শরীরের একাধিক অঙ্গকে প্রভাবিত করে। টাইফয়েড রোগের জীবাণু রক্তে প্রবাহে পৌঁছানোর পর লিভার ,পিত্তথলি  ও পেশি সহ গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ট্র্যাক্টে আক্রমণ করে থাকে। অনেক সময় লিভার ফুলে যায়।  টাইফয়েড ব্যাকটেরিয়া রক্তের মাধ্যমে আমাদের শরীরের পিত্তথলি ,ফুসফুস এবং কিডনিতে পৌঁছাতে পারে। 


টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ গুলো কি কি


টাইফয়েড জ্বর সাধারণত শরীরের ভেতর রোগ জীবাণু প্রবেশের ১০ থেকে ১৪ দিন পর এর লক্ষণ সমূহ ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে। তবে টাইফয়েড রোগের  প্রধান লক্ষণ হল জ্বর হওয়া। যেটা প্রথম চার পাঁচ দিন জ্বর বৃদ্ধি পেতে থাকে আবার কখনো কখনো কমতে থাকে। তবে কোন সময়ই জ্বর সম্পূর্ণ ছেড়ে যায় না। এর প্রধান লক্ষণসমূহ নিচে দেওয়া হল:

  • শরীর ম্যাজ ম্যাজ  করা।
  • মাথা সহ হাত পায়ের পেশীতে ব্যথা হতে পারে 
  • বয়স্কদের কুষ্ঠ কাঠিন্য হতে দেখা যায় 
  • ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর হতে পারে 
  • শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া ও বমি হয়ে থাকে 
  • অনেক সময় প্রচন্ড পেটে ব্যথা হতে পারে 
  • এই রোগ হওয়ার দ্বিতীয় সপ্তাহে গোলাপি রঙের দানা রোগীর পেটে ও পিঠে দেখা যেতে পারে 
  • অনেক সময় জ্বরের সাথে কাশি হয়ে থাকে 
  • মানুষের হার্ট রেট স্পন্দন কমে যেতে পারে 
  • ক্ষুধামন্দা হতে পারে 
  • শারীরিক দুর্বলতা দেখা যেতে পারে 
  • ওষুধ সেবন করা অবস্থায়ও সপ্তাহ খানেক জ্বর থাকতে পারে। 


টাইফয়েড জ্বরের চিকিৎসা


টাইফয়েড জ্বরের আক্রান্ত  হওয়ার পর যদি দ্রুত চিকিৎসা না করানো হয় তাহলে জ্বর সপ্তাহ অথবা মাস ব্যাপী থাকতে পারে এবং জ্বরের পাশাপাশি রুগী অন্যান্য সমস্যায়ও ভুগতে পারে। সাধারণত টাইফয়েড জ্বরের রোগীদের চিকিৎসকরা দিনে চার থেকে পাঁচ বার প্যারাসিটামল জাতীয় ট্যাবলেট সেবন করার পরামর্শ দিয়ে থাকে। তবে টাইফয়েড রোগের প্রধান চিকিৎসা হিসাবে ডাক্তারগণ এন্টিবায়োটিক দেন ।


এন্টিবায়োটিক সেবন করা সত্ত্বেও জ্বর সাথে সাথে না কমে এটা  ৫-৬ দিন শরীরে অবস্থান করতে পারে। চিকিৎসার পাশাপাশি টাইফয়েড রোগীদের অধিক পরিমাণে তরল খাবার দেওয়া উচিত। কেননা জ্বর ও ডায়রিয়া শরীরে অনেক দিন থাকার কারণে পানি স্বল্পতা দেখা দিতে পারে। যদি মানবদেহে অধিক পরিমাণে পানি স্বল্পতা দেখা যায় তাহলে শিরা পথে ওষুধ প্রদানের মাধ্যমেও তরল জাতীয় খাবার প্রদান করা যেতে পারে।


অবশ্যই  টাইফয়েড রোগীকে  পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে। যদি রোগীর জ্বর অনেক থাকে তাহলে ভেজা গামছা বা তোয়ালে দিয়ে রোগীর সারা শরীর মুছে দেওয়া উত্তম। অসুস্থ থাকা অবস্থায় রোগী যে পুষ্টি হারিয়েছে তা পুনরুদ্ধার করার জন্য অধিক ক্যালোরি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করতে হবে । সবসময় বাথরুম থেকে আসার পর সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধুতে হবে । চিকিৎসক যতক্ষণ পর্যন্ত এন্টিবায়োটিক খাওয়া থেকে বিরত থাকতে নিষেধ না করবেন ততদিন পর্যন্ত অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে যেতে হবে। কারণ এন্টিবায়োটিক না খাওয়ার কারণে জীবাণু না মরে কিডনি বা পিত্ত থলিতেও থেকে যেতে পারে। সেখান থেকে এই জীবাণু দেহের অন্যান্য স্থানে সংক্রমণিত হতে পারে। 


টাইফয়েড জ্বরের প্রতিরোধে করণীয় সমূহ


টাইফয়েড রোগ থেকে বেঁচে থাকার অন্যতম উপায় হচ্ছে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টাইফয়েড জ্বরের জন্য নির্ধারিত টিকা গ্রহণ করা। বাজারে দুই ধরনের ভ্যাকসিন পাওয়া যায় ১.ইনজেকশন ২. মুখে খাওয়ার। তবে অবশ্যই ভ্যাকসিন গ্রহণ করার ব্যাপারে চিকিৎসক অথবা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। যদিও ভ্যাকসিন সব সময় কার্যকর হয় না তাই এই রোগ প্রতিরোধের জন্য ভ্যাকসিনের পাশাপাশি নিম্নলিখিত পদক্ষেপ সমূহ গ্রহণ করতে হবে। 


যেকোনো ধরনের খাবার যেমন শাক-সবজি ,ফলমূল ইত্যাদি সবসময় পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নিতে হবে। রান্নার বাসনপত্র সব সময় পরিষ্কার রাখতে হবে। আমরা যে খাবারটা খাব তা ভালোভাবে রান্না বা সিদ্ধ করে নিতে হবে। অবশ্যই খাবার গ্রহণের পূর্বে খুব ভালোভাবে হাত ধৌত করতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধ  পানি সংরক্ষণ করতে হবে এবং সেই পানি যেন দূষিত না হতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।


তবে ২৪ ঘন্টার মধ্যে বেশি সংরক্ষিত রয়েছে এমন পানি পান না করায় উত্তম। আমাদের ব্যবহারিত টয়লেট সবসময় পরিষ্কার রাখতে হবে। রাস্তার পাশে যেসব দোকানে খাবার পাওয়া যায় সেসব খাবার গ্রহণ ও পানি পান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। টয়লেট ব্যবহার করার পর এবং শিশুকে পরিষ্কার করার আগে, খাবার প্রস্তুত করার আগে, নিজে অথবা শিশুকে খাওয়ানোর পূর্বে, অবশ্যই সাবান দিয়ে দুই হাত ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে। 


টাইফয়েড থেকে বেঁচে থাকার অন্যতম উপায় হলো সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা। আমরা অনেকেই ভ্রমণ করতে খুব পছন্দ করি। যার ফলে আমাদের অনেক সময়ই বাহিরে খেতে হয়। আর ওইসব এলাকার বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের নিশ্চিত করা হয় না বলে এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। সেক্ষেত্রে আমাদের সবারই টাইফয়েড প্রবন এলাকা পরিদর্শনকালে ,বাহিরের খাওয়া-দাওয়া ও পানি পান করার ক্ষেত্রে অধিক সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। 




Post a Comment

0 Comments