Ticker

6/recent/ticker-posts

শিশুর টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা



 শিশুর টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

গ্রীষ্মকালের অতিরিক্ত গরমের পর বর্ষাকাল আমাদের সবার জন্যসস্থির বার্তা বহন করে নিয়ে আসে। তবে বর্ষাকাল আসার সঙ্গে সঙ্গে সাথে করে নিয়ে আসে নানা রকম অসুখ।  বিশেষ করে আমাদের যাদের শিশু বাচ্চা রয়েছে তাদের সমস্যাটা হয় আরো বেশি।


বর্ষাকালে সকল ধরনের অসুখের মধ্যে টাইফয়েডের প্রকোপ অনেক বেড়ে যায়। টাইফয়েড হচ্ছে এক ধরনের পানি বাহিত রোগ। এটা সাধারণত দূষিত পানি ও খাবার এর মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে। আর টাইফয়েড রোগের একমাত্র বাহক হচ্ছে মানুষ। টাইফয়েডের ব্যাকটেরিয়া যদি কোন ভাবে পানীয় জাতীয় খাবারের মাঝে প্রবেশ করতে পারে আর সেটা যদি আমাদের শরীরে যায় তাহলে টাইফয়েড হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। আর অনেক সময় খাবারের মাধ্যমেও টাইফয়েড ছড়িয়ে  থাকে।


টাইফয়েড থেকে বেঁচে থাকার জন্য শুধু বাচ্চাই নয় , বাবা-মা সহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে অধিক বেশি যত্নশীল হতে হবে। তাহলে শিশুসহ পরিবারের সবাই টাইফয়েড রোগ থেকে মুক্তি পাবে। 


সূচিপত্র:

টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ ,প্রতিরোধ ও চিকিৎসা 
টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ ও উপসর্গ 
শিশুদের টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ ও উপসর্গ 
টাইফয়েড এর চিকিৎসা
টাইফয়েড হলে কখন হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন 
টাইফয়েড জ্বরের প্রতিরোধে করণীয়



টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ ও উপসর্গ


সাধারণত টাইফয়েড রোগের প্রধান লক্ষণ হিসেবে জ্বর কে ধরা হয়। জ্বরের সাথে মাথা ব্যথা বা শরীর কাঁপুনির মতো আনুষাঙ্গিক আরো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এছাড়া টাইফয়েডের অন্যান্য উপসর্গ গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পেট ব্যথা ,পেট খারাপ হওয়া ,বমি হওয়া এবং সাথে কাশি হওয়া। সাধারণত কাশি শুরু হয় টাইফয়েড হওয়ার ৪-৫ দিন পর থেকে ,যেটাকে বলা হয় ব্রঙ্কাইটিস।


টাইফয়েডের যে ব্যাকটেরিয়া রয়েছে তা শরীরে প্রবেশ করার চার থেকে পাঁচ দিন পর এর লক্ষণ গুলো আস্তে আস্তে প্রকাশ পায়। রোগটি যদি অনেক বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায় তাহলে অন্ত্র  ছিড়ে  যেতে অথবা ফুটো হয়ে যাওয়ার অনেক বেশি সম্ভাবনা থাকে। অনেক সময় দেখা যায় টাইফয়েড থেকে সুস্থ হওয়ার পরেও টাইফয়েডের জীবাণু গল ব্লাডারে জমা থাকে। গল ব্লাডার এর জীবাণু ইউরিন এর মাধ্যমে বের হয়ে অন্যান্য মানুষকেও আক্রমণ করতে পারে। তাই এসব বিষয়ে আমাদের অধিক সতর্ক থাকতে হবে। 



শিশুদের টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ ও উপসর্গ


বয়স বেঁধে শিশুদের টাইফয়েড জ্বরের উপসর্গতা অনেক সময় ভিন্নতা দেখা যায়। সাধারণত এক বছরের কম বয়সী যেসব শিশু রয়েছে সেসব শিশুদের ক্ষেত্রে টাইফয়েডের সামান্য পেটের অসুখ থেকে শুরু করে মারাত্মক সমস্যা হতে পারে।  গর্ভাবস্থায় মায়ের থেকে গর্ভের শিশুর শরীরে টাইফয়েড জীবাণু সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।


সাধারণত এর উপসর্গগুলো জন্মের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দেখা যায়।কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে বমি হওয়া, পেট ব্যথা ,পেট ফাঁপা, ডায়রিয়া ,তীব্র জ্বর, খিচুনি ,যকৃতের আকার বৃদ্ধি হওয়া ,জন্ডিস ,ওজন কমে যাওয়ার মত সমস্যাগুলো অনেক বেশি দেখা যায়। 


আবার বেশি বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়। এই সময় সাধারণত টাইফয়েডের ক্ষেত্রে তাদের বেলায় প্রাথমিক উপসর্গগুলো হল জ্বর, ক্লান্তি,  মাথা ব্যথা ,পেটব্যথা ,ডায়রিয়া ,কুষ্ঠ কাঠিন্য, কাশি ইত্যাদি। এক সপ্তাহের মধ্যে জ্বরের মাত্রা অনেক বেড়ে যায় এবং তা আর কমে না এবং অন্যান্য উপসর্গগুলো অনেক বেশি তীব্র তর হয়ে থাকে। শিশু খুব দ্রুত নিস্তেজ হয়ে পরে।


পেটে এবং বুকের নিচের অংশে কোনো  কোনো ক্ষেত্রে রেশ দেখা যেতে পারে।  যদি এটার প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা শুরু না করা হয় তাহলে অনেক ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। অন্ত্রে ফুটো হয়ে তীব্র রক্তপাত ও পেরিটোনাইটিস, নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিস, পিত্তথলির প্রদাহ, টকসিক মাইয়োকার্ডাইটিস, সেপটিক আর্থ্রাইটিস ইত্যাদি ধরনের সমস্যা হতে পারে। 



টাইফয়েড এর চিকিৎসা


টাইফয়েড এর লক্ষণগুলো আপনার শিশুর মধ্যে দেখার সাথে সাথে যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। টাইফয়েড এর ডায়গনোসিস করার জন্য বিশেষ কয়েকটা টেস্ট রয়েছে। যেগুলো খুব দ্রুত করিয়ে নিতে হবে। টেস্টগুলো হল ব্লাড কালচার ,স্টুল কালচার, ইউরিন কালচার।


সাধারণত টাইফয়েড হলে এন্টিবায়োটিক ওষুধ দিয়েই এর চিকিৎসা করা হয়। পাশাপাশি জ্বর কমানোর জন্য জ্বরের ঔষধ খেতে হয় এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। আবার যখন জ্বর কমে যায় তখন সাধারণত ৫ থেকে ৬ দিনের একটি অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স দেওয়া হয়ে থাকে। অথবা ১০ থেকে ১২ দিন এই এন্টিবায়োটিক চালিয়ে যেতে বলা হয়ে থাকে। 


তবে টাইফয়েড আক্রান্ত শিশুর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে এবং শিশুর স্বাভাবিক খাবার দাবার বজায় রাখতে হবে। পাশাপাশি শিশুকে তরল খাবার ও বেশি পানি পান করাতে হবে। শিশু যদি মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন দ্রুত চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করে তার ব্যবস্থা নিতে হবে অথবা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।



টাইফয়েড হলে কখন হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন


সাধারণত সব সময় টাইফয়েড জ্বরের ক্ষেত্রে ভর্তির প্রয়োজন নাও হতে পারে। টাইফয়েড জ্বরের  কিছু ক্ষেত্রে যেমন যদি হালকা ও তাড়াতাড়ি রোগ শনাক্ত হয় তাহলে মুখের ঔষধে রোগ ভালো হয়ে যায়। যদি আপনার শিশু খুবই দুর্বল অনুভব করে, ঠিকমতো খাওয়ার দাওয়া করতে না পারে অথবা বমি করে তাহলে সেই ক্ষেত্রে ইনজেকশনের মাধ্যমে এবং গ্লুকোজ বা স্যালাইন ইনফিউশনের জন্য এন্টিবায়োটিক দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে।


সে সময় হাসপাতলে ভর্তি কিংবা ক্লিনিকে ভর্তি করা প্রয়োজন হয়। যখন কোন শিশু টাইফয়েড জ্বরের জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে যায় তখন তাদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি প্রয়োজন পড়ে। টাইফয়েড হল অন্ত্রের  একটি সংক্রমণ, যেটি সংক্রমণের কারণে অন্ত্রনালী ফুলে যায়। তাই অনেক সময় মুখে দেওয়া এন্টিবায়োটিক গুলো ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। সে ক্ষেত্রে ওষুধ গুলো সঠিকভাবে শোষিত হয় না এবং যার ফলে সিরাপ বা ট্যাবলেট অর্থাৎ মুখের ঔষধ গুলো কাজ করতে ব্যর্থ হতে পারে। সেজন্য শিরায় এন্টিবায়োটিক দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে যার ফলে  অবশ্যই হাসপাতাল অথবা ক্লিনিকে ভর্তির প্রয়োজন হয়। 



টাইফয়েড জ্বরের প্রতিরোধে করণীয়


যে সব স্থানে পয়ঃনিষ্কাশন  ও স্যানেটেশন ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত সেখানে টাইফয়েডের বিস্তার ঘটার সম্ভাবনা অধিক। সেজন্য এসব স্থানে পানি স্যানিটেশন ও  হাইজিন এর প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। তবে টাইফয়েড জ্বরের জন্য প্রতিরোধের জন্য টিকা বা ভ্যাকসিন অনেক বেশি সুরক্ষা প্রধান করে থাকে।


যেহেতু টাইফয়েড রোগ  পানি ও খাদ্য এর মাদ্দমে ছড়াতে পারে এবং টাইফয়েড আক্রান্ত রোগীদের মূত্র বা প্রস্রাবে এবং পানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে দূষিত করতে পারে তাই পানি পান করার আগে অবশ্যই সেই পানি ফুটিয়ে পান করতে হবে। বাসি , খোলা অথবা কম রান্না করা খাদ্য ,কাঁচা শাকসবজি, দূষিত দুধ বা দুগ্ধ জাত  পণ্য ইত্যাদি খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বলতে টয়লেট শেষে ,খাওয়ার বা শিশুকে খাওয়ানোর আগে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া। ব্যবহারের আগে প্লেট বাটি চামচ ইত্যাদি পরিষ্কার সাবান পানি দিয়ে ধোঁয়া। এইগুলো খুব যত্ন সহকারে মেনে চলতে হবে। 


আমাদের দেশের টাইফয়েডের টিকা পাওয়া যায়। টাইফয়েডের টিকা টাইফয়েড প্রতিরোধের জন্য অনেক সহায়তা করে। টাইফয়েড প্রতিরোধকারী বিভিন্ন ধরনের ভ্যাকসিন রয়েছে যেগুলো আপনার শিশুর জন্য অনেক বেশি উপযুক্ত। আর আপনার শিশুর জন্য কোন ভ্যাকসিন গুলো উপযুক্ত তা জানতে আপনাকে সর্বদা আপনার শিশু বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ নিতে হবে। 


Post a Comment

0 Comments