Ticker

6/recent/ticker-posts

নবজাতক শিশুদের ঠান্ডা লাগলে করণীয়



 নবজাতক শিশুদের ঠান্ডা লাগলে করণীয়

নবজাতক শিশুদের প্রায় সময়ই অনেক বেশি ঠান্ডা লাগে এবং যার প্রাথমিক কারণ হলো তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত অপরিণত। শীতকালে নবজাতক শিশুর প্রায় সময়ই নানা ধরনের অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকে। এই সময় একজন নবজাতক কয়েকটি সাধারণ অসুখে আক্রান্ত হতে পারে ,যেমন জ্বর ভাইরাস জ্বর, ঠান্ডা, কাশি, কানে সংক্রমণ ও ফ্লু ইত্যাদি। 


 সাধারণত শীতের সকালে অনেক বেশি ঠান্ডা থাকে। বেলা আস্তে আস্তে বাড়ার সাথে সাথেই তাপমাত্রাও বেড়ে যায়। আবার সন্ধ্যা বাড়ার সাথে সাথে  অনেক বেশি ঠান্ডা পড়ে। কখনো হয়তো শুষ্ক দমকা বাতাসে হঠাৎ করেই শীতের তীব্রতা অনেক বেড়ে যায়।


আবহাওয়ার এরকম তারতম্যের সাথে যে কারো খারাপ খাওয়ানো অনেক কঠিন ব্যাপার। শিশুদের ক্ষেত্রে খাপ খাওয়ানো ব্যাপারটা আরো জটিল সমস্যা। এজন্য এই সময় শিশুদের সাধারণ ঠান্ডা লাগাটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। আর এইসব ঠান্ডা থেকে শিশু জ্বর ও গলা ব্যথা সহ নানা ধরনের জটিলতায় পড়তে পারে। আর এসব সমস্যা থেকে পরিত্রাণের জন্য আমাদের ঠান্ডা লাগার কারণ লক্ষণ ও প্রতিরোধের উপায় গুলো জানা অনেক বেশি জরুরী। 



শিশুর ঠান্ডা লাগার সাধারণ কারণ গুলো কি


সাধারণত নবজাতক শিশুর ঠান্ডা লাগার জন্য ২০০ টি ভাইরাস দায়ী ,এর মধ্যে যেকোনো একটি দ্বারা সংক্রমিত হলেই শিশুর ঠান্ডা লাগতে পারে। তবে শিশুদের মধ্যে সাধারণ ঠান্ডা লাগার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী হচ্ছে রাইনো ভাইরাস। সাধারণ ঠান্ডা নাক এবং গলাকে সংক্রমণিত করে থাকে।


এখন ঠান্ডা সম্পর্কে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো একবার একটি নির্দিষ্ট ঠান্ডার দ্বারা  সংক্রমণিত হলে আপনার শিশু সেই ভাইরাস থেকে মুক্তি পেয়ে যায়। তবে মনে রাখা ভালো যে অনেক ঠান্ডা সৃষ্টিকারী ভাইরাস রয়েছে ,তাই আপনার সন্তান দুই বছর বয়সের মধ্যে ঠান্ডার বেশ কয়েকটি সমস্যায় পড়তে পারে। যেহেতু ঠান্ডা হচ্ছে এক ধরনের সংক্রামক রোগ। ঠান্ডা বিভিন্ন কারণে ছড়াতে পারে তার মধ্যে অন্যতম হলো


বায়ুর মাধ্যমে সাধারণত যদি কোন সংক্রমণিত ব্যক্তির কাশি হয়, সে কথা বলে এবং হাঁচি হয় সেই সময় তার ভাইরাস হাঁচি ,কাশি ,কথা বলার মাধ্যমে ছড়িয়ে যেতে পারে। 


স্পর্শের মাধ্যমে যখন কোন সংক্রমিত  ব্যক্তি আপনার সন্তানকে স্পর্শ করে সেই স্পর্শ করার মাধ্যমে আপনার বাচ্চার কাছে ভাইরাসটি পাস্ করে। 


ব্যক্তির পৃষ্ঠতলের মাধ্যমে আপনার শিশু সংক্রমণিত খেলনা বা অন্য যে কোন পিষ্ঠ স্পর্শ করে ভাইরাস পেতে পারে ,কেননা এই ভাইরাস দুই ঘন্টা বা তার বেশি সময় ধরে থাকতে পারে। 



নবজাতক শিশুর ঠান্ডার লক্ষণ ও উপসর্গ


নিচের এই লক্ষণ ও উপসর্গগুলো পর্যবেক্ষণ করার মাধ্যমে বুঝতে পারবেন যে আপনার শিশু ঠান্ডায় সংক্রমিত হয়েছে। শিশুর ঠান্ডা লাগলে কাশি হতে পারে। এছাড়া গলা ব্যথা ,চোখ লাল হয়ে যাওয়া, কানে ব্যথা ,১০১ ডিগ্রী ফারেনহাইট এর বেশি জ্বর হওয়া , শিশুর ক্ষুদামন্দা হওয়া ,তাছাড়া মাথার পিছনে এবং বগলের নিচে লুসিকা  গ্রন্থী ফুলে যাওয়া ইত্যাদি ধরনের উপসর্গ গুলো দেখা যেতে পারে।


এছাড়া আপনার নবজাতক শিশু অস্থির হয়ে যেতে পারে অথবা নাক বন্ধ থাকার  কারণে ঘুম নাও আসতে পারে। ঠান্ডা থাকার কারণে আপনার শিশু খেতে কমে চাইবে ,কেননা আপনার বাচ্চা তার নাক বড়দের মতো ঝাড়তে পারবে না।তাই তার নাকের শ্লেষ্মা  ঘন ঘন পরিষ্কার করে দিতে হবে। যেহেতু আপনার বাচ্চার নাক বন্ধ থাকবে সেহেতু সে সবসময় উদ্বেগজনক অবস্থায়  থাকবে। 


শিশুদের সাধারণ ঠান্ডা থেকে হতে পারে যেসব জটিলতা 


আপনার শিশুর সাধারণ ঠান্ডা থেকে হতে পারে জটিল ধরনের সমস্যা। যেমন মারাত্মক কানের সংক্রমণ যা ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস এর মাধ্যমে আপনার শিশুর কানের পর্দার পেছনের স্থান প্রবেশ করে।  কিছু ক্ষেত্রে ঠান্ডা বাঁশির  মতো শব্দসহ শ্বাস-প্রশ্বাস হয়ে যায় ,এটি আপনার সন্তানকে হাঁপানি রোগিদের  মতো ভোগাতে পারে।


আর এই সময় হাঁপানি যুক্ত বাচ্চাদের আরও খারাপ পরিবেশ তৈরি করে। একটি চিকিৎসা বিহীন সাধারণ ঠান্ডা আরেকটি বিপরীত অবস্থার দিকে পরিচালিত করতে পারে। তাছাড়া অন্যান্য জটিলতা গুলোর মধ্যে রয়েছে নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কিওলাইটিস, এবং ক্রুপ।



নবজাতক শিশুর ঠান্ডার জন্য চিকিৎসা

সাধারণ ঠান্ডার জন্য শিশুদের তেমন বিশেষ কোন চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে না। তবে আপনি এই ক্ষেত্রে ঠান্ডার উপসর্গ ও দুর্দশা উপশম করে আরাম দিতে চাইলে কিছু সহজ জিনিস করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে লক্ষণীয় যদি বাচ্চা ঠান্ডা গুরুতর হয়ে যায় এবং এক সপ্তাহ পরেও তার ঠান্ডা দূর না হয় সেক্ষেত্রে অবশ্যই গুরুতর কিছু না হওয়া নিশ্চিত করার জন্য আপনি বিশেষজ্ঞ অথবা ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন। 


আপনার শিশু যেন ঠান্ডার সময় অনেক বেশি বিশ্রাম পায় তার নিশ্চিত করতে হবে। সবসময় চেষ্টা করুন এবং আপনার শিশুকে কিছু অতিরিক্ত বার বুকের দুধ খেতে দিন। যদি দেখেন আপনার শিশু সূত্র দুধ বা কঠিন খাবার খায় তবে অবশ্যই খেয়াল রাখুন যেন সে প্রচুর পানি পান করে। তবে আপনার শিশুকে চাইলে আপনি ভিটামিন সি যুক্ত ফল অথবা ফলের রসগুলো খেতে দিতে পারেন।


আপনার বাচ্চার বয়স যদি তিন মাস অথবা তার বেশি হয় তাহলে আপনার শিশুর জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল দিতে পারেন। তবে প্যারাসিটামল দেওয়ার আগে অবশ্যই আপনি আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নিতে হবে। কখনোই পরামর্শ ছাড়া আপনার শিশুকে ঠান্ডার কোন ঔষধ সরবরাহ করবেন না।এই সময় বালিশ ব্যবহার না করাই উত্তম কারণ এতে করে আপনার শিশুর দম বন্ধ হয়ে যেতে পারে। 


আপনার বাচ্চা যদি তার নাক বন্ধ হওয়ার কারণে খাওয়া কঠিন হয়ে যায় ,তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে কথা বলুন এবং নাকের ব্লক পরিস্কার করার জন্য আপনার ডাক্তারকে লবণাক্ত নাসাল ড্রপ  দেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে পারেন। প্রবাহিত শ্লেষ্মা অপসারণ করার জন্য আপনার শিশুর নাক মুছে দিন এবং তার ত্বকের জ্বালা এড়ানোর জন্য নাকের চারপাশে ত্বক আদ্র করতে একটি হালকা পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করতে পারেন।


যেকোনো ধরনের বাহ্যিক পণ্য যেটা আপনি ব্যবহার করেন তা ঘরোয়া প্রতিকার নয় এই বিষয়টি নিশ্চিত করুন। লক্ষণ ছাড়া একটি নাক বন্ধ থাকে তাহলে তার নাকের ছিদ্র পরীক্ষা করে দেখেন যে তার নাকে কোন বাইরের জিনিস আটকে আছে কিনা। 



ঠান্ডায় শিশুর নাক বন্ধ হলে যা করবেন


অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে আপনার শিশুর নাক বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে শিশুর স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস এ অনেক ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। সাধারণত এলার্জি, শুষ্ক বায়ু বা সাধারণ ঠান্ডার মতো ভাইরাস সংক্রমণের ফলে নাক বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যেহেতু শিশুরা নিজেরাই তাদের শ্লেষ্মা পরিষ্কার করতে পারে না সে কারণে সমস্যাটি তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।


তবে শিশুর নাক বন্ধ হয়ে গেলে "দ্রুত স্যালাইনের পানি একটি নাকের ড্রপার এর সাহায্যে শিশু নাকে একটু একটু করে দিলে ধীরে ধীরে পরিষ্কার হবে। শিশুর জন্য একমাত্র স্যালাইন দ্রবণই হলো নিরাপদ অনুনাসিক স্প্রে। "  এটা ব্যবহার এর জন্য আপনার শিশুকে সোজা করে শুইয়ে দিন। যদি সম্ভব হয় তাহলে মাথাটি সামান্য কাত  করুন ,তারপর প্রতিটি নাসারন্ধ্রে দুই থেকে তিন ফোঁটা স্যালাইন স্প্রে করুন , এতে করে হাঁচি আসতে পারে, যেটা স্বাভাবিক ব্যাপার। যদি নাক  থেকে কোন তরল পদার্থ বের হয় তাহলে সেটা টিস্যু দিয়ে মুছে ফেলুন।


এছাড়া আরেকটি উপায় হল শিশুকে স্টিম বাথ  দেওয়া। এজন্য আপনি আপনার শিশুকে নিয়ে একটি বাথরুমে কিছুক্ষণ স্টিম ভাত নিন। গরমের বাষ্প যুক্ত বাথরুমে থাকার ফলে শিশু বন্ধ না খুলে যাবে। 



বাচ্চার ঠান্ডা লাগলে গোসল করানো যাবে কি


আমাদের প্রচলিত সমাজে অনেকেরই একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে ঠান্ডা সর্দি লাগলে বাচ্চাদের গোসল করানো যাবে না। আসলে ঠান্ডা সর্দি যে শুধুমাত্র গোসল করানোর ফলেই হয় এমনটা নয়। আবহাওয়া ,রোগ  জীবাণু, ঘাম গায়ে শুকিয়ে যাওয়া ,এরকম নানা কারণের  জন্যেও ঠান্ডা হতে পারে।


তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আবহাওয়া আর রোগ জীবাণু থেকে ঠান্ডা বেশি হয়ে থাকে। গোসল না করানোর  ফলে বেবি ঘামে  বেশি আর এই ঘাম গায়ে শুকায় কারণ মায়েরা ভেবে থাকে সর্দি লাগছে ,কাশি হচ্ছে যার ফলে ভারী কাপড় পরিয়ে রাখে আর এতে করে বাচ্চা ঘেমে আরো ঠান্ডায় বেশি আক্রান্ত হতে থাকে।  ঠান্ডা সর্দি লাগার পরেও শিশুদের গোসল করানো উচিত।


তবে সেই ক্ষেত্রে কুসুম গরম পানি দিয়ে গোসল করানো উচিত। গোসলের পানি আগে থেকে ফুটিয়ে নিতে হবে ,ফুটানোর সময় পানিতে হালকা লবণ মেশানো উত্তম। লবণ মেশানো কুসুম গরম পানি বাচ্চা শরীরে জীবাণু নাশক হিসেবে কাজ করে। তবে গোসলের আগে সরিষার তেল ,কালিজিরা ,রসুন মিশিয়ে হালকা গরম করে সেটা আপনার শিশুর বুকে পিঠে গলায় মালিশ করতে পারেন।


সর্দির জন্য এই তেল মালিশ অনেক বেশি উপকারী। সরিষার তেল, কালিজিরা ,রসুন কুচি একটা বোতলে গরম জায়গায় সংরক্ষণ করে রাখতে পারেন। গোসলের আগে এক চামচ তেল নিয়ে গরম করে সেটা আপনার শিশুর বুকে পিঠে মালিশ করতে পারেন। 



ঠান্ডা জনিত সমস্যা প্রতিরোধের উপায়


ঠান্ডা আবহাওয়ায় আপনার শিশুকে চাদর অথবা গরম কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখুন। আপনার শিশুর যদি হাঁপানিজনিত কারণে বারবার কাশি হয়। তাহলে অবশ্যই হাঁপানির জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। শিশুকে ঠান্ডা সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য টিকা দিতে হবে। সবসময় সাধারণ পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে যেমন নিয়মিত হাত ধোয়া, নাকে মুখে বারবার হাত না দেওয়া ইত্যাদি। 


Post a Comment

0 Comments