Ticker

6/recent/ticker-posts

ডেঙ্গু জ্বরের কারণ ,লক্ষণ ও চিকিৎসা



 ডেঙ্গু জ্বরের কারণ ,লক্ষণ ও চিকিৎসা

ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াবহতা গত দুই  দশক জুড়ে অনেক আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দিন দিন সংক্রমণের সংখ্যা বাড়ছে অধিক হারে। শুধু যে আমাদের বাংলাদেশেই এই প্রকোপ বাড়ছে তা কিন্তু নয় ,এটা সারা বিশ্বের দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ, ল্যাটিন  আমেরিকা এবং আফ্রিকায় সবচেয়ে বেশি আকার ধারণ করেছে। পুরো ভারতবর্ষে প্রধানত গ্রীষ্মের শুরুতে এবং বর্ষার সময় এই রোগ অনেক হারে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। 


আর ডেঙ্গু সংক্রমনের হার সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত ,তবে এটা এপ্রিল মাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে বৃদ্ধি পায়। আবার এটা ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে জুলাই মাস থেকে। ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ দিকে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতি বছরই সারা বিশ্বে লক্ষ লক্ষ মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে থাকে। আর সময় ও অঞ্চল ভেদে এই রোগ  মহামারির আকার ও ধারণ করে থাকে। চিকিৎসা বিহীন ,ভুল চিকিৎসার কারণে এবং দেরিতে চিকিৎসা হওয়ার ফলে অনেক ক্ষেত্রেই অনেক রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হয়ে থাকে। 


সূচিপত্র:

ডেঙ্গু জ্বরের  কারণ ,লক্ষণ ও চিকিৎসা 
ডেঙ্গু জ্বরের কারণ কি 
ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও উপসর্গ গুলো কি 
ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণসমূহ 
হেমোরেজিক ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণসমূহ 
ডেঙ্গু জ্বরের  চিকিৎসা



ডেঙ্গু জ্বরের কারণ কি


সাধারণত আমরা অনেকেই মনে করে থাকি এডিস মশা কামড়ালে মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়। এটা আসলে ভুল ধারণা। চিকিৎসকরা বলে থাকেন যে ,পরিবেশে উপস্থিত কোন ভাইরাস যদি কোন এডিস মশার মধ্যে সংক্রমিত হয় আর শুধুমাত্র তখনই সেই সংক্রমণিত মশার কামড়ের কারণে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।


ডেঙ্গু জ্বর হচ্ছে একটি ভাইরাস সংক্রমণিত রোগ সাধারণত এডিস  প্রজাতির মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। এই মশা শুধু ডেঙ্গু নয় সাথে জিকা , চিকনগুনিয়া এবং অন্যান্য ভাইরাসগুলো ছড়িয়ে  থাকে। আর ডেঙ্গু ভাইরাসের মধ্যে চার ধরনের সেরোটাইপ রয়েছে।  আর এ কারণে একজন ব্যক্তি তার পুরো জীবদ্দশায় চার বারের মতো ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।


তবে যারা ইতিপূর্বে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে তাদের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তা মারাত্মক হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ডেঙ্গু বাহিত কোনো মশা যদি কোন ব্যক্তিকে কামড়ায় সেই ব্যক্তি চার থেকে ছয় দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে থাকে। আর যদি এই আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোন জীবাণুবিহীন এডিস  মশা কামড়ালে সেই মশাটিও জীবাণু বহনকারী মশাই পরিণত হয়। আর এইভাবে একজনের দেহ থেকে অন্যজনের দেহে ডেঙ্গু ছড়িয়ে  পড়ে। 



ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও উপসর্গগুলো কি


ডেঙ্গু জ্বর সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে একটি হল ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বর এবং অন্যটি হলো হেমোরেজিক  ডেঙ্গু জ্বর। প্রকারভেদ অনুসারে ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। নিচে দুই ধরণের ডেঙ্গু জ্বর এর লক্ষণ  সম্পর্কে আলোচনা করা হলো। 


ক্লাসিকাল ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ সমূহ


ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বর যখন মানুষের শরীরে সংক্রমণিত হয় তখন সাধারণত শরীরে তীব্র জ্বরের সাথে তীব্র ব্যথা হয়ে থাকে। আর কখনো কখনো জ্বরের মাত্রা ১০৫ ফারেনহাইট ছাড়িয়ে পরে।  এই ব্যথা বিশেষ করে শরীরের বিভিন্ন জোড়ায় যেমন কোমর, পিঠের অস্থিসন্ধি ও মাংসপেশিতে অনেক বেশি তীব্র হয়ে থাকে।  তাছাড়া মাথায় ও চোখের পিছনের অংশে অনেক ব্যথা হতে পারে।


কোন কোন সময় ব্যথার মাত্রা এত তীব্র আকার হয়ে থাকে যে মনে হয় শরীরের হারগুলো ভেঙে যাচ্ছে, যার ফলে অনেক সময় এই জ্বরকে "হাড়ভাঙ্গা জ্বর " বলা হয়ে থাকে। জ্বর হওয়ার চার-পাঁচ দিন পর শরীরে লালচে দানাযুক্ত এলার্জি বা ঘামাচির মত বিশেষ কিছু দেখা দিতে পারে। এমনকি রোগীর বমি বমি ভাব কিংবা বমি হতে পারে। যার ফলে রোগী অনেক বেশি ক্লান্তি বোধ করে থাকে। এগুলোর পাশাপাশি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর খাওয়ার রুচি  অনেক কমে যায়।


কোন কোন ক্ষেত্রে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর দুই বা তিনদিন পর পর শরীরের জ্বর আসে। আর যার ফলে এটাকে বাই ফেজিক ফিভারও  বলা হয়।  তবে ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণগুলো রোগীর বয়স অনুযায়ী ভিন্নতা হতে পারে। ছোট বাচ্চা ও প্রথমবার আক্রান্ত রোগীর চেয়ে শিশু ,বয়স্ক ও দ্বিতীয়বার আক্রান্ত রোগীর ব্যথা অনেক বেশি তীব্র হয়ে থাকে। 



হেমোরেজিক ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণসমূহ


হেমোরেজিক ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তির অবস্থা অনেক বেশি জটিল আকার ধারণ করে থাকে। এরকম জ্বরে  আক্রান্ত শরীর বিভিন্ন অংশ থেকে যেমন চামড়ার নিচে ,চোখের মধ্যে এবং চোখের বাইরে, নাক ,মুখ ,দাঁতের মাড়ি কিংবা কফের সাথে রক্ত বমি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া কালো কিংবা আলকাতরার মত পায়খানা হতে পারে ,এমনকি পায়খানার সাথে রক্ত বের হতে পারে।


আবার মেয়েদের ক্ষেত্রে ঋতুস্রাব অসময়ে হতে দেখা যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে এই রক্তক্ষরণ অনেকদিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এই ডেঙ্গু জ্বর হলে অনেকের বুকেও পেটে পানি জমার মতো উপসর্গ দেখা যেতে পারে।যদি এই ডেঙ্গু জ্বর লিভার আক্রান্ত হয় তাহলে রোগীর জন্ডিস  দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে।  কোন কোন ক্ষেত্রে কিডনি আক্রান্ত হয়ে রেনাল ফেইলুরের এর মত ঘটনা দেখা যায়।


ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াবহ সম্পর্কে একটি স্বরূপ চিত্র হচ্ছে ডেঙ্গু শক  সিনড্রোম।  এটাতে আক্রান্ত হওয়ার ফলে শরীরের রক্তচাপ হঠাৎ কমে যেতে পারে। আর তাছাড়া অন্যান্য সমস্যা গুলোর মধ্যে নারীর স্পন্দন অত্যন্ত ক্ষীণ ও দ্রুত হওয়া ,হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া ,প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, রোগী হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ইত্যাদিসহ ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তির  মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। 



ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা


ডেঙ্গু জ্বরের এখনো কোনো কার্যকরী টিকা বা ঔষধ আবিষ্কার হয়নি। তাই প্রতিরোধী হচ্ছে এর উত্তম ব্যবস্থা। যেকোনো রোগে বা রোগের উপসর্গ দেখা দেওয়া মাত্রই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কেননা ডাক্তারের নির্দেশনা ছাড়া ঔষধ গ্রহণ করলে কিংবা কোন পদক্ষেপ নিজ  থেকে নিলে অনেক সময় তা মারাত্মক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়। তাই নিজেকে ডেঙ্গু জ্বর থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বাসায় প্রাথমিক পরিচর্যা ও চিকিৎসা শুরু করা উত্তম। ডেঙ্গু জ্বরের যেহেতু নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই তাই চলুন জেনে নেই ডেঙ্গুর প্রতিকারে কি কি  করা প্রয়োজন। 


ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর জ্বর কমানোর জন্য শুধু প্যারাসিটামল বা এই ধরনের ঔষধ গুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। শরীরের জ্বরের তাপমাত্রার উপর নির্ভর করে ছয়  থেকে আট ঘণ্টা পরপর এই ঔষধ গুলো সেবন করতে পারেন।  তবে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি দিনে চারটি ঔষধ গ্রহণ করতে পারেন। চারটির বেশি ওষুধ নিলে লিভারের সমস্যা সহ নানা ধরনের জটিলতা আপনার মাঝে দেখা দিতে পারে।


ডেঙ্গু জ্বরের ক্ষেত্রে জ্বর কমাতে গিয়ে এসপিরিন অথবা ব্যথা নাশক এন এস এ আইডি গ্রুপের ঔষধ সমূহ ব্যবহার করতে সম্পূর্ণভাবে নিষেধ করেন ডাক্তাররা। আপনি আপনার শরীরের জ্বর কমানোর জন্য পানিতে কাপড় ভিজিয়ে সারা শরীর মুছে নিতে পারেন অথবা চাইলে গোসল করতে পারেন। এক্ষেত্রে এটা অনেক কার্যকরী।


ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর অধিক বমি হওয়ার কারণে অনেক সময় ক্লান্ত থাকেন। তাই তাদেরকে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশ্রাম নেওয়া অনেক বেশি জরুরী। ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর থেকে সাত থেকে দশ দিন পর্যন্ত কোন ধরনের ভারী কাজ বা অতিরিক্ত পরিশ্রম না করাই উত্তম। তবে তাই বলে শুধু শুয়ে বসে থাকাটাও উচিত নয়। স্বাভাবিক হাঁটাচলা এবং দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যাওয়া এক্ষেত্রে অনেক উত্তম। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর বাসার বাহিরে না যাওয়ায় ভালো। 


Post a Comment

0 Comments