Ticker

6/recent/ticker-posts

কোরবানির মাংস খাওয়ার নিয়ম

 

কোরবানির মাংস খাওয়ার নিয়ম

মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি মুসলমানের দুটি প্রধান উৎসব হচ্ছে ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহা। আর কয়েকদিন পরেই আমাদের ঈদুল আযহা পালিত হতে যাচ্ছে।  ইসলাম ধর্মের ইতিহাস অনেক বেশি পুরনো আর ইসলাম ধর্মে কুরবানীর ইতিহাস তত  বেশি পুরনো। আমরা কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য লাভ ও সন্তুষ্ট অর্জন করে থাকি। কুরবানী করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের সর্বাধিক প্রিয় বস্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করা। পশু কুরবানীর মাধ্যমে আমাদের অন্তর হয় পরিশুদ্ধ আর এটাই হচ্ছে কুরবানীর মূল প্রেরণা।  কুরবানী করার পশুর  রক্ত মাংস কিছুই আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না। আল্লাহর কাছে শুধু পৌঁছায় তাকওয়া। 

সূচিপত্র :

কোরবানির মাংস খাওয়ার নিয়ম

কুরবানির মাংস বন্টন করার সঠিক নিয়ম

কুরবানীর মাংস যদি দান না করা হয় তাহলে কি ক্ষতি হবে?

কুরবানীর মাংস সবার জন্য খাওয়া কি বাধ্যতামূলক ?

কুরবানীর মাংস বিতরণে সতর্কতা

ধনী ও অমুসলিমদের কুরবানির মাংস কি দেওয়া যাবে ?

কুরবানীর মাংস বিতরণে সামাজিক ভুল প্রচলন 

কুরবানীকৃত পশুর পা  মাথাভাগের ক্ষেত্রে করণীয়

কোরবানির মাংস অতিরিক্ত খাওয়ার স্বাস্থ্য ঝুঁকি গুলো কি কি


কুরবানির মাংস বন্টন করার সঠিক নিয়ম


কুরবানী করার পশুর  গোশত আপনি নিজে খেতে পারেন ,হাদিয়া দিতে পারেন, এমনকি সদকা করতে পারেনা।  আর এটার দলিল হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার বাণী।  আল্লাহ বলেন "অতঃপর তোমরা তা থেকে খাও এবং দুস্থ অভাবীকে আহার করাও "(সূরা হজ আয়াত -২৮ )এ ছাড়া আল্লাহ আরো বলেন যে "তখন তোমরা তার থেকে খাও এবং আহার করাও এমন দরিদ্রকে যে ভিক্ষা করে এবং ওইসব দরিদ্রকে যারা ভিক্ষা করে না। এভাবে আমরা সেগুলোকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছি যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। (সূরা হজ -৩৬)


হাদিসে সালামা বিন আকওয়া (রাঃ)থেকে বর্ণিত হয়েছে -যে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেছেন "তোমরা খাও ,খাওয়াও এবং সংরক্ষণ করে রাখো " ( সহীহ বুখারী) এখানে খাওয়াও শব্দটি তারা ধনীদেরকে হাদিয়া দেওয়া এবং দরিদ্রদেরকে দান করাকে বোঝানো হয়েছে। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত রয়েছে যে -হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেছেন "তোমরা খাও সংরক্ষণ করে রাখো এবং দান করো।" (সহীহ মুসলিম) 


আরো পড়ুন কোরবানি করার নিয়ম ও পদ্ধতি


তবে বিভিন্ন আলেমগণ কুরবানীর মাংস কতটুকু খাওয়া যাবে ,কতটুকু পরিমাণ হাদিয়া দেওয়া যাবে এবং কতটুকু সদকা  করা যাবে এ ব্যাপারে মতভেদ করেছেন। তবে বেশিরভাগ অভিমত হচ্ছে এক তৃতীয়াংশ খাওয়া  যাবে ,এক তৃতীয়াংশ হাদিয়া দেওয়া যাবে এবং বাকি এক অংশ সদকা করা যাবে। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে যে অংশটুকু খাওয়া যাবে আপনি সে অংশটুকু সংরক্ষণ করেও রাখতে পারেন। যদি দীর্ঘদিন পর্যন্ত হয়ে থাকে সেটাও জায়েজ রয়েছে। তবে সে ক্ষেত্রে যদি দুর্ভিক্ষের বছর হয়ে থাকে তাহলে কোরবানির মাংস তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করা জায়েজ নয়।  


সালামা বিন আকওয়া (রাঃ )এর হাদিস থেকে পাওয়া যায় যে -রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেন "তোমাদের কুরবানীর মাংস তিনদিনের পরের ভোর এ যেন কোন অংশ কারো ঘর থেকে না পাওয়া যায়।  " পরের বছর সাহাবায়ে কেরামরা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করলেন আমরা কি গত বছরের ন্যায় করব ?তখন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম তাদের উত্তর দিলেন তোমরা খাও,খাওয়াও , সংরক্ষণ করে রাখো।  ওই বছর মানুষ অনেক বেশি কষ্টে ছিল ,তাই আমি চেয়েছি তোমরা তাদেরকে সহযোগিতা করো। "(সহীহ মুসলিম ও সহীহ বুখারী )


আরো পড়ুন ঈদ উল আযহার নামাজ পড়ার নিয়ম


যেকোনো ধরনের কুরবানী হোক না কেন অর্থাৎ ওয়াজিব কুরবানী হোক কিংবা নফল কুরবানী হোক কুরবানীর গোস্ত খাওয়ার ক্ষেত্রে কোন পার্থক্য নেই। ঠিক তেমনি ভাবে জীবিত ব্যক্তি ক্ষেত্রে কুরবানী অথবা মৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রে কুরবানী কিংবা ওসিয়ত কারীর কুরবানী হোক না কেন এই বিধানের কোন পার্থক্য নেই। 



কুরবানীর মাংস যদি দান না করা হয় তাহলে কি ক্ষতি হবে?


কুরবানী করা পশুর মত তার মাংসের মালিকও হচ্ছে কুরবানী দাতা। সে ক্ষেত্রে কুরবানী করা মাংস নিজে খাওয়া অথবা কাউকে দেওয়া এটা তার একান্তই ইচ্ছার উপর নির্ভর করে থাকে। কুরবানী দাতা চাইলে যেমন পুরোটাই বিতরণ করে দিতে পারেন আবার চাইলে পুরোটা খাওয়ার অধিকার রয়েছে। এই সম্পর্কে হাদিস শরীফে এসেছে আল্লাহর রাসূল বলেছেন "তোমরা কুরবানীর মাংস যতটুকু ইচ্ছা খাও  অন্যদেরকেও খাওয়াও এবং যতটুকুই ইচ্ছা জমা করে রাখো। "(সুনানে তিরমিযী ,হাদিস -১৫১০)


কুরবানীর মাংস সবার জন্য খাওয়া কি বাধ্যতামূলক ?

আসলে কুরবানির মাংস খাওয়া সবার জন্যই বাধ্যতামূলক নয়। তবে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর সুন্নাহর মধ্যে পড়ে কুরবানীর মাংস খাওয়া। কেননা যেহেতু হযরত মোহাম্মদ সাঃ কোরবানির মাংস খেয়েছেন, সেহেতু যদি কেউ কুরবানী দিয়ে থাকে তাহলে সেই কুরবানীর মাংস খাওয়া তার জন্য উত্তম। তাছাড়া আল্লাহ বলেন যে "তোমরা কুরবানীর মাংস খাও" তাই আল্লাহর এই আদেশ মানা আমাদের জন্য উত্তম ,তবে কুরবানীর গোশত  খাওয়া বাধ্যতামূলক নয়। 


ধনী ও অমুসলিমদের কুরবানির মাংস কি দেওয়া যাবে ?


আমরা আগেই বলেছি যে কুরবানীর মাংস কুরবানী দাতার নিজস্ব সম্পদ তাই তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে উপহার হিসেবে কোরবানির মাংস দিতে পারবেন। তাছাড়া কুরবানীর গোশত অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের কেউ দেওয়া জায়েজ রয়েছে। সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাঃ ) তার ইহুদি প্রতিবেশীদেরকে গোস্ত দিয়ে বন্টন শুরু করেছিলেন (বুখারি, আদাবুল মুফরাদ, হাদিস নং ১২৮)।


কুরবানীর মাংস বিতরণে সতর্কতা


কুরবানী যদি মান্নতের হয়ে থাকে তাহলে সেই ক্ষেত্রে কুরবানীর মাংস পুরোটাই বিতরণ করে দিতে হবে।  মান্নতের কুরবানীর মাংস মানত কারী এবং তার পরিবারের কেউ খেতে পারবে না। পুরো মাংসই বিতরণ করে দিতে হবে এবং শুধুমাত্র যারা যাকাত গ্রহণের উপযোগী তাদেরকেই দেওয়া যাবে ধনীদের মান্নতের মাংস দেওয়া যাবে না। (বাদায়েউস সানায়ে - ৪/১৯৫ ও রদ্দুল মুহতার - ৩/৭৩৭)


কুরবানীর মাংস বিতরণে সামাজিক ভুল প্রচলন


কুরবানীর মাংস বিতরণে সামাজিকভাবে কিছু ভুল প্রচলন রয়েছে যে সকল কুরবানী দাতা থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ একটা অংশ যে অংশ গরিবদের জন্য রাখা হয় সেই অংশ সংগ্রহ করে তা আবার সমাজের প্রতিটি ঘরে ভাগ করে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে বেশিরভাগ কুরবানী দাতাই চক্ষু লজ্জার ভয়ে কিংবা সামাজিক চাপে পড়েই মাংস দিতে বাধ্য হয়ে থাকেন। এই সময় দেখা যায় যে এক্ষেত্রে ধনী গরিব এমনকি কুরবানী দাতা নিজেও এই মাংস পেয়ে থাকে। কিন্তু সমাজে সকলের কুরবানীর মধ্যে অনেকের কুরবানী থাকে মান্নতের। এই  মান্নতের কুরবানীর গোশত  শুধু গরিবদের অধিকার রয়েছে। তাই এই ধরনের বন্টন জায়েজ নয়। তবে যদি কুরবানী মান্নতের না হয় এবং কুরবানী দাতা  স্বেচ্ছায় এখানে মাংস দেন এবং যদি সেই মাংস শুধু গরিবদের মাঝেই বিতরণ করা হয় তাহলে জায়েজ হবে। 


কুরবানীকৃত পশুর পা  মাথাভাগের ক্ষেত্রে করণীয়


আমরা অনেকেই কোরবানির সময় একাধিক শরীকে কুরবানী করে থাকি।  একাধিক শরীকে কুরবানী করার ক্ষেত্রে অবশ্যই ওজন করে মাংস বন্টন করতে হবে অনুমান করে মাংস বন্টন করা জায়েজ নয়। পা ও মাথার ক্ষেত্রেও রয়েছে একই বিধান তবে এই ক্ষেত্রে যদি কেউ নিজের অংশ অন্য কাউকে দিয়ে দেয় তাহলে কোন নিষেধ নেই। (আদ্দুররুল মুখতার :- ৬/৩১৭, কাজিখান :- ৩/৩৫১)


কোরবানির মাংস অতিরিক্ত খাওয়ার স্বাস্থ্য ঝুঁকি গুলো কি কি


সাধারণত অতিরিক্ত মাংস খাওয়ার ফলে কুষ্টকাঠিন্য, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা ও ডায়রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি মানবদেহের ইউরিক এসিডের পরিমাণও অনেক বেড়ে যায়। অতিরিক্ত মাংস খাওয়ার ফেলে বড় বড় রোগের সূত্রপাত ঘটে থাকে।  ঈদের সময় আমরা সাধারণত গরু মহিষ ও খাসির  বেশিরভাগ লাল মাংসই খেয়ে থাকি। আর এসব লাল মাংস খাওয়ার ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাছাড়া স্ট্রোকের ঝুঁকিও অনেক বেড়ে যায়।


আরো পড়ুন কুরবানির মাসআলা


পাকস্থলী ক্ষদ্রান্ত্র , বৃহদান্ত্র , প্রোস্টেড  ও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিও তৈরি হয়। এছাড়া নানা ধরনের রোগের দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে ফুসফুস। আর্থাইটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। পিত্তথলিতে পাথর পেপটিক  আলসার সহ কিডনির জটিলতা হতে পারে। তাই কুরবানির মাংস অবশ্যই খাওয়ার সময় আমাদের পরিমাণ মতো খেতে হবে। এই সময় সাধারণত প্রতিবেলায় দুই থেকে তিন টুকরা মাংস খাওয়া যেতে পারে।  তবে একজন পূর্ণ বয়স্ক সুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রতিদিন ১০০ গ্রাম প্রোটিন গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে তবুও ৭০ গ্রামের বেশি খাওয়া উচিত নয়। অতিরিক্ত কোন কিছুই স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। 


Post a Comment

0 Comments