Ticker

6/recent/ticker-posts

শিশুদের ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ



 শিশুদের ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

ডেঙ্গু হলো একটি ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু জ্বর হয়ে থাকে। আমাদের বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে ব্যাপক হারে ডেঙ্গু জ্বরে  আক্রান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। আর বাংলাদেশে  আক্রান্তদের একটি বড় অংশ হচ্ছে শিশু। শিশুরা সাধারণত তাদের শারীরিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন বা সতর্ক নয়। আর তাদের শারীরিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন বা সতর্ক না হওয়ার কারণে তাদের উপর এই রোগের প্রভাব বিস্তার বড়দের চাইতেও অধিক। আর এ অবস্থায় আমাদের বাবা-মা বা অভিভাবকদেরই সবচেয়ে বেশি সচেতনতার সাথে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। 


সূচিপত্র:

শিশুদের ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
শিশুদের ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ সমূহ কি কি
শিশুদের ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা
শিশুদের ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধে করণীয় সমূহ


শিশুদের ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ সমূহ কি কি


আপনার বাচ্চার যদি উচ্চ তাপমাত্রাসহ শরীরে জ্বর থাকে ,নাক দিয়ে পানি পড়তে থাকে ও কাশি থাকে তাহলে এই লক্ষণ গুলো ডেঙ্গুর লক্ষণ হতে পারে। যদিও এই লক্ষণগুলো সাধারণত ফ্লু এর উপসর্গ। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো যদি জ্বর ২৪ ঘন্টা থেকে বেশি সময় ধরে থাকে তাহলে অবশ্যই আপনি আপনার শিশুকে চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করান। ডেঙ্গু জ্বরের সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার মাধ্যমে সেই জ্বর আসলে ডেঙ্গু জ্বর কিনা তা সনাক্ত করা হচ্ছে সর্বোচ্চ উত্তম কাজ। 


বয়স্ক মানুষ তাদের শারীরিক কোন সমস্যা হলে তাদের শরীরে বাস্তবিক কি সমস্যা হচ্ছে তারা সহজেই বুঝতে পারে। কিন্তু বয়স্ক মানুষের তুলনায় ,স্বাভাবিক ভাবেই শিশুরা বুঝতে অক্ষম হয় যে তাদের শরীরে আসলে কি হচ্ছে। যার ফলে বাচ্চাদের মাঝে বিরক্তি কর ভাব ও ব্যবহারের পরিবর্তন দেখা যায়। সাধারণত এই সময় তাদের স্বভাব খিটখিটে  হয়ে যায় এবং প্রায় সময়ই দেখা যায় ওদের খিদে কমে যায়। আর এই উপসর্গ গুলো ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ হতে পারে। 


ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর শিশুরা সাধারণত শারীরিক পীড়ায়  ভুগে থাকে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে গুরুতরপ্রকারের জয়েন্টে ব্যথা, পিঠে ব্যথা ,মাথায় ব্যথা ইত্যাদি ধরনের লক্ষণ গুলো দেখা যায়। এরকম সমস্যা হলে শিশুদের সাথে নিরন্তর কথা বলে তাদের সমস্যার বিষয়ে যতটুকু সম্ভব জানার চেষ্টা করতে হবে। আর তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে আপনি ডাক্তারের সাথে সেই অনুযায়ী আলোচনা করতে পারেন। 


ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর শিশুরা গ্যাস্ট্রো-ইন্টেস্টাইনাল  সমস্যায় ভুগতে পারে। এ সময় সাধারণত বমি বমি ভাব কিংবা বমি হওয়ার মতো উপসর্গগুলোকে ভুলবশত আমরা অনেকেই গ্যাস্ট্রো-ইন্টেস্টাইনাল বলে মনে করে থাকি। আর যার ফলে শিশুদের তলপেটে অত্যাধিক ব্যথায় অনুভূতি হতে পারে। এরকম সমস্যা হলে অবশ্যই দ্রুত ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা উচিত। 


ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর শিশুদের মধ্যে অনেক ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তার মধ্যে অন্যতম সমস্যা হচ্ছে ত্বকে র‍্যাশ হওয়া।  সাধারণত শিশুদের শরীরে মিজেলের মত চাকা চাকা হয়ে থাকে এবং আরেকটি লক্ষণ হল ক্রমাগত চুলকানো। এরকম সমস্যা গুলো দেখা দিলে অবশ্যই ডেঙ্গুর সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তার শনাক্ত করা জরুরী। 


ডেঙ্গু জ্বরের আক্রান্ত হওয়ার পর আমাদের শরীরের প্লেটলেটের সংখ্যা কমে যায়। আর প্লেটলেটের  সংখ্যা কম হয়ে যাওয়ার কারণে শিশুদের মাড়ি  ও নাক থেকে রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে। আর শিশুদের এরকম সমস্যা দেখা দিলে তৎক্ষণাৎ  আবশ্যক  পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। কেননা অনেক সময় এই ধরনের ঘটনা থেকে হেমারেজ  অথবা শক সিন্ড্রোম  হতে পারে ,যা শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। 


ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার আরেকটি মারাত্মক লক্ষণ হল ৬ থেকে ৮ ঘন্টার মধ্যে প্রস্রাব না হওয়া এরকম হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। পাশাপাশি  এই সময় শিশুদের হতে পারে পানি শূন্যতা এবং পাতলা পায়খানা। 


শিশুদের ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা


উপরের শিশুদের ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণগুলো দেখা দেওয়া মাত্রই আপনার প্রথম কাজ হচ্ছে তার ডেঙ্গু হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া। তবে উপরের উপসর্গগুলো দেখা দেওয়া মাত্রই আপনি নিম্নত্ব পদক্ষেপগুলো নিতে পারেন। 


  • ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গগুলো দেখা দেওয়া মাত্রই আপনি দ্রুত শিশু চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন। আর তিনি প্রয়োজনীয় পরবর্তী পদক্ষেপ গুলো নেওয়ার পরামর্শ দিবেন। 
  • আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে যেন আপনার বাচ্চা অবসাদগ্রস্থ হয়ে না পড়ে। কেননা উপসর্গের কঠোরতার কারণে অন্ততপক্ষে পনেরো দিন থেকে আরম্ভ করে এক মাস পর্যন্ত শিশুর বেড রেস্ট  নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। 
  • পথ্য হিসাবে আপনি আপনার শিশুকে হালকা খাদ্য গুলো দিতে পারেন। হালকা খাদ্যের মধ্যে রয়েছে স্যুপ , ফল, সিদ্ধ করা তরকারি ইত্যাদি। 
  • আর যদি আপনার বাচ্চা তার মায়ের বুকের দুধ পান করে তাহলে একবারের জন্যেও যেন দুধ পান করা থেকে বিরত না থাকে। আর সাধারণত বড় শিশুদের ক্ষেত্রে শিশুদেরকে হাইড্রেটেড (জলয়োজিত) থাকতে হবে এবং সাথে ওরাল (মৌখিক) জলয়োজন বিকল্প  বিবেচনা করতে পারেন সে ক্ষেত্রে উত্তম হচ্ছে ইলেকট্রোলাইট। 
  • আপনার শিশুর শরীরের তাপমাত্রা কম করার জন্য ঠান্ডা জলে ভেজানো কাপড় অথবা স্পঞ্জ ব্যবহার করতে পারেন। এতে শিশুর তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করবে। 


শিশুদের ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধে করণীয় সমূহ


সর্বপ্রথম আমাদের শিশুদের জন্য এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যেন তাদেরকে মশা না কামড়ায়।  এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো :


এডিস মশা যেখানে জন্মাতে পারে অর্থাৎ এডিস মশার উৎস স্থল ধ্বংস করতে হবে। সাধারণত এডিস মশা আমাদের গৃহস্থলীর পরিষ্কার স্থির পানিতে বংশবিস্তার করে থাকে। যেমন ফুলের টব ,গাড়ির টায়ার বা ডাবের খোলে, বৃষ্টির জমা পানি ইত্যাদি। আর এসব জায়গার পানি গুলো অনেক সময় দরে স্থির থাকে  বিধায় এখানে সহজেই এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। তাই আমাদের সর্বপ্রথম কাজ হচ্ছে যেই স্থানগুলোতে এডিস মশার লার্ভা জন্ম নিতে পারে সেই স্থানগুলো চিহ্নিত করা এবং পরবর্তীতে সেগুলোকে নষ্ট করে ফেলতে হবে। আমাদের বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। 


মশার উৎপাত থেকে শিশুকে রক্ষা করার জন্য দিনে ও রাতে শিশুদেরকে মশারির ভেতর রাখতে হবে। বিশেষ করে যেসব নবজাতক শিশু রয়েছে তাদেরকে সব সময় মশারির ভেতরে রাখা জরুরী। এছাড়া হাসপাতাল গুলোতে যদি কোন শিশু অন্য সব রোগের চিকিৎসা ও নিতে আসে সে ক্ষেত্রেও শিশুদেরকে মশারির ভেতরে রাখা জরুরি। কেননা ডেঙ্গু আক্রান্ত কোনো ব্যক্তিকে এডিস মশা কামড়ানোর ফলে সে মশাও ডেঙ্গু আক্রান্ত মশা হিসেবে পরিগণিত হয়। আর এই ডেঙ্গু আক্রান্ত এডিস মশা কোনো সুস্থ  শিশুকে কামড়ালে তার শরীরেও ডেঙ্গুর ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। 


শিশুরা দিনের অনেক সময়ই বাহিরে দৌড়াদৌড়ি বা ছোটাছোটি করে থাকে। তাই শিশুরা দিনের যে সময়টায় বাহিরে ছোট ছুটি বা খেলাধুলা করে থাকে সেই সময়টাতে তাদের শরীরে মশা নিরোধিকরণ স্প্রে, ক্রিম বা জেল ব্যবহার করতে পারেন। তাহলে শিশু মশার কামড় থেকে রক্ষা পাবে এবং এটা কয়েক ঘন্টা অন্তর পুনরায় প্রয়োগ করতে হবে। তবে আপনার শিশু যদি অনেক ছোট হয় অর্থাৎ তার শরীরে যদি মশা নিরোধিকরণ স্প্রে ক্রিম বা জেল ব্যবহার করা না যায় তাহলে তার ব্যবহারিত পোশাকে এসব ব্যবহার করা যেতে পারে। 


মশার কামড় থেকে আপনার শিশুকে রক্ষা করার জন্য আরেকটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হচ্ছে শিশুদেরকে ফুলহাতা ও ফুলপ্যান্ট পরিয়ে রাখা। 


আমরা অনেক সময়ই মশার কামড় থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মশা প্রতিরোধই এরোসেল, মশার কয়েল বা ফাস্ট কার্ড ব্যবহার করে থাকি। এগুলো শিশু থেকে শুরু করে সবার জন্যই অনেক বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। তাই এসবের পরিবর্তে মস্কুইটো কিলার বাল্ব , ইলেকট্রিক কিলার ল্যাম্প ,ইলেকট্রিক কয়েল, মসকুইটো কিলার ব্যাট, মসকুইটো রেপেলার মেশিন, মসকুইটো কিলার ট্র্যাপ ইত্যাদি ধরনের সরঞ্জাম গুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এই সরঞ্জাম গুলো যেন শিশুর হাতের নাগালের বাইরে থাকে। 


অনেক সময় শিশুর মায়েরা ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। এই সময় মায়েদের বুকের দুধে কোন ডেঙ্গু জ্বরের প্রভাব পড়ে না। তাই কোন মা যদি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয় তাহলে সেই শিশু অবশ্যই তার মায়ের বুকের দুধ খেতে পারবে। 



আমাদের দেশের বেশিরভাগ এলাকায় গ্রীষ্মমন্ডলীয় জলবায়ুর সম্মুখীন হয়ে থাকে এবং যার কারণে ডেঙ্গু মহামারীর আক্রমণ সবথেকে বেশি দেখা যায়। যদি আপনার শিশুর মাঝে কোন ধরনের ডেঙ্গু রোগের উপসর্গ দেখা যায় তাহলে এই আর্টিকেলে উল্লেখিত পদক্ষেপ গুলো গ্রহণ করুন।  তবে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করা সবচেয়ে বেশি জরুরী তাহলে আর  কেউ সহজেই সংক্রমিত হবে না। 


Post a Comment

0 Comments