Ticker

6/recent/ticker-posts

নবজাতক শিশুর জন্ডিস হলে করনীয়



 নবজাতক শিশুর জন্ডিস হলে করনীয়

আমাদের দেশে খুব কমন একটি রোগ হচ্ছে জন্ডিস। প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদেরও এই রোগ হওয়া সম্ভাবনা রয়েছে। যখন একটি শিশুর যকৃত পুরোপুরি কর্মক্ষম হয়ে উঠতে কিছুটা দেরি হয় তখন রক্তে বিলুরুবিনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ফলে জন্ডিসের দেখা দেয়। তবে সাধারণত যেসব বাচ্চা সময় হওয়ার আগেই জন্মগ্রহণ করে কিংবা অল্প ওজন নিয়ে ভূমিষ্ঠ হয় সেই সব শিশুরাই জন্ডিসের আক্রান্ত বেশি হয়ে থাকে।

একটি গবেষণায় দেখা যায় প্রায় শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ নবজাতক  জন্মের পরপরই জন্ডিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেই ক্ষেত্রে ৫০ ভাগের বেলায় বলা হয় এটিকে সাধারণ জন্ডিস বা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস বলা হয়ে থাকে। বিভিন্ন কারণে শিশুদের জন্ডিস হতে পারে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মা ও শিশুর রক্তের গ্রুপের ভিন্নতা ,গর্ব অবস্থায় মায়ের কোন সংক্রমণের ইতিহাস থাকলে ,শিশু যদি কোন জন্মগত রোগে আক্রান্ত হয় ,জন্মের পরেই যদি শিশুর রক্তে সংক্রমণ বা সেপটিসেমিয়া দেখা দেয়, জন্মগত ভাবে কোনো সমস্যার কারণ, যদি শিশু সঠিক সময়ে বুকের দুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে না পায় ইত্যাদি। আজকে আমরা একজন নবজাতক শিশুর জন্ডিস হলে কি কি করণীয় এর লক্ষণ গুলো কি কি এসব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

সূচিপত্র:

  • নবজাতক শিশুর জন্ডিস হলে করনীয়
  • নবজাতকের জন্ডিস কত প্রকার
  • নবজাতকের জন্ডিসের কারণ
  • নবজাতক শিশুদের জন্ডিসের লক্ষণ
  • নবজাতকের জন্ডিসের স্বাভাবিক মাত্রা কত
  • যেসব নবজাতক শিশুদের জন্য জন্ডিস পরীক্ষা অত্যাবশ্যকীয়
  • নবজাতক শিশুর জন্ডিস প্রতিরোধে করণীয়

  • নবজাতকের জন্ডিসের চিকিৎসা


নবজাতকের জন্ডিস কত প্রকার

নবজাতকের জন্ডিসকে সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। 

  1. ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস বা সাধারণ জন্ডিস 
  2. ক্লিনিক্যাল জন্ডিস।


ক্লিনিক্যাল জন্ডিসকে আবার কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। .

  • জন্মের ২৪ ঘন্টার মধ্যে এই সময় সাধারণত মা ও নবজাতকের রক্তের ভিন্নতা  সমস্যা কিংবা মায়ের পেটে থাকাকালীন সময়ে কোন ইনফেকশন অথবা গ্লুকোজ সিক্স ফসফেট ডিহাইড্রোজেনিক বা স্বল্পতা ইত্যাদি কারণে এই জন্ডিস এই সময়ে হয়ে থাকে। 
  • শিশু জন্মের ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জন্ডিস এই সময় সাধারণত যদি শিশু প্রিম্যাচিওর বা অপরিণত অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয় কিংবা জন্মকালীন শ্বাসকষ্ট , এসিডেসিস, হাইপোথারমিয়া বা শরীরের তাপমাত্রা অতিরিক্ত কমে যাওয়া, হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা রক্তে গ্লুকোজের স্বল্পতা, অথবা শিশুর কোন ইনফেকশন যদি থাকে তাহলে এই সময় জন্ডিস হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। 
  • শিশু জন্মের ৭২ ঘণ্টা পর জন্ডিস যদি শিশু জন্মগ্রহণ করার 72 ঘন্টা পার হয়ে যায় এবং তখন যদি জন্ডিস হয় তাহলে বুঝতে হবে সেপ্টিসেমিয়া বা রক্তের ইনফেকশন, নিওন্যাটাল হেপাটাইটিস, ব্রেস্ট মিল্ক জন্ডিস বা মায়ের বুকের দুধের মাধ্যমে জন্ডিস, হাইপোথাইরয়েড, বিলিয়ারি এন্ট্রিসিয়া, গ্যালাকটোসিমিয়া, সিস্টিক ফাইব্রোসিস, কনজেনিটাল হাইপারট্রফিক পাইলোরিক স্টেনোসিস ইত্যাদি কারণে এই জন্ডিস গুলো হয়েছে।


নবজাতকের জন্ডিসের কারণ

নবজাতক শিশুর জন্ডিস এ  আক্রান্ত হওয়ার কিছু প্রধান কারণ নিচে দেওয়া হল :

  • সময়ের পূর্বে শিশুর জন্ম নেওয়া যখন একটি শিশু সময়ের পূর্বে ভূমিষ্ঠ হয় তখন তার শরীর থেকে বিলুরুবিন অপসারণ করতে অক্ষম হয়ে থাকে। 
  • বুকের দুধ খাওয়ানোর সমস্যা শিশু জন্মের পর প্রথম কয়েকদিন যদি শিশু বুকের দুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে না পায় তাহলে জন্ডিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। 
  • রক্তের ধরন শিশু ও মায়ের রক্তের গ্রুপ যদি ভিন্ন হয় সেই ক্ষেত্রে মায়ের শরীরে উৎপন্ন এন্টিবডি শিশুর শরীরের লোহিত রক্ত কণিকাকে আক্রমণ করে। যার ফলে জন্ডিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। 
  • জেনেটিক সমস্যা বিভিন্ন ধরনের সমস্যার কারণে লোহিত রক্ত কণিকা দুর্বল হয়ে পড়ে। যার ফলে এই কোষগুলো সহজেই ভেঙে যায় এবং উচ্চ পরিমাণের বিলিরুবিন তৈরি করে। যার ফলে শিশুর জন্ডিসের আক্রান্ত হয়।
  • রক্তে সংক্রমণ বা সেপ্সিস
  • লাল রক্ত কোষ এনজাইম বা লাল রক্ত কোষ ঝিল্লির ত্রুটি
  • অভ্যন্তরীণ রক্তপাত
  • মায়ের ডায়াবেটিস
  • পলিসাইথেমিয়া 
  • সন্তানের জন্মের সময় থেঁতলে যাওয়া
  • গ্যালাকটোসেমিয়া – গ্যালাকটোস শর্করার পাচন সঠিক ভাবে সম্পন্ন হয় না
  • বিলিরুবিন নিষ্পত্তির জন্য অপরিহার্য উৎসেচক অপর্যাপ্ত থাকে
  • হাইপোথাইরয়েডিজম
  • সিস্টিক ফাইব্রোসিস
  • যকৃতের প্রদাহ


নবজাতক শিশুদের জন্ডিসের লক্ষণ

নবজাতক শিশুর জন্ডিস হওয়ার অন্যতম কিছু লক্ষণ নিচে আলোকপাত করা হলো।  

  • শিশুর গায়ের চামড়া হলুদ রঙের দৃশ্যমান  হওয়া হলো জন্ডিসের অন্যতম লক্ষণ। তবে নবজাতকের জন্ডিসের ক্ষেত্রে চামড়ার উপসর্গ  সর্বপ্রথম মুখে দেখা যায় ,তারপর ধীরে ধীরে শরীরের অন্যাংশে দৃশ্যমান হয়। 
  • শিশুর যদি ঝিমুনি ভাব থাকে তাহলে সেটা তীব্র জন্ডিসের একটি উপসর্গ। 
  • বিভিন্ন ধরনের স্নায়ুবিক লক্ষণ যেমন খিচুনি, উচ্চ মাত্রার কান্না, পেশীর ধরনের পরিবর্তন ইত্যাদি। 
  • শিশুর প্রস্রাবের রং গাঢ় এবং হলুদ হওয়া 
  • নবজাতক শিশু সঠিকভাবে না খাওয়া
  • জন্ডিসের অন্যতম আরেকটি  লক্ষণ হলো শিশুর চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যাওয়া। তবে যদি জন্ডিসের পরিমাণ  চরম আকার ধারণ করে সেই ক্ষেত্রে শিশুর হাত-পা এবং পেট  হলুদ রঙের হয়ে যায়।


নবজাতকের জন্ডিসের স্বাভাবিক মাত্রা কত

যদি রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা ১৫ মিলিগ্রাম / ডেসির  নিচে থাকে তাহলে এটাকে বলা হয় সাময়িক জন্ডিস। এটার জন্য সাধারণত কোন ধরনের চিকিৎসার প্রয়োজন নাই। তবে যদি এই বিলিরুবিনের মাত্রা ০.৫ মিলিগ্রাম হারে প্রতি ঘন্টায় বাড়তে থাকে এবং যদি সেটা ২৫ মিলিগ্রাম এর বেশি হয় তাহলে এই জন্ডিসকে বলা হয় বিপদজনক জন্ডিস। তার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। 


যেসব নবজাতক শিশুদের জন্য জন্ডিস পরীক্ষা অত্যাবশ্যকীয়

কিছু কিছু নবজাতক শিশুদের ক্ষেত্রে জন্ডিস পরীক্ষা অতি জরুরি হয়ে পড়ে। যেমন যেসব বাচ্চা অপুষ্ট হয়ে জন্মগ্রহণ করে ,গর্ভসময়ের চেয়েও ছোট ওজনের বাচ্চা প্রসব করে কিংবা যেসব বাচ্চাদের মাথা ছোট হয়,যেসব বাচ্চাদের চেহারা ফ্যাকাসে হয় অর্থাৎ রক্তকণিকা ভেঙে গিয়েছে, যদি বাচ্চাদের নাভিতে ঘা দেখা দেয় ,লিভার ,প্লীহা যদি বড় হয়ে যায়,থাইরয়েড হরমোন এর পরিমাণ কম হলে, চামড়ার নিচে রক্তক্ষরণ ,মাথার চামড়া বা চামড়ায় নীল অথবা কালো দাগ ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিলে বাচ্চাদের জরুরি ভিত্ত্বিতে  জন্ডিস পরীক্ষা করা প্রয়োজন।


নবজাতক শিশুর জন্ডিস প্রতিরোধে করণীয়

নবজাতকের জন্ডিস প্রতিরোধ করার জন্য মায়ের দিকে বেশি খেয়াল রাখতে হবে। অর্থাৎ মায়ের পুষ্টি ,বিশ্রাম, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হাঁপানি ইত্যাদি বিষয় গুলো ঠিক রেখে সুস্থ শিশুর জন্মদান দিতে  সহায়তা করতে হবে। শিশু জন্মগ্রহণ করার পর তাকে পরিস্কার ও শুষ্ক রাখা, হাত পা না ধুয়ে বাচ্চাকে না ধরা।

বাচ্চাকে বাহিরের খাবার না দিয়ে বাচ্চার মায়ের বুকের শালদুধ বেশি বেশি খেতে দিন। বাচ্চা হওয়ার পূর্বেই বাচ্চার মাকে হেপাটাইটিস বি টিকা দিন, যদি বাচ্চা মায়ের রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ এবং বাচ্চার বাবার রক্তের গ্রুপ পজেটিভ হয় তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এন্টি-ডি  দিন। যদি থাইরয়েড ওষুধ খেয়ে থাকে কিংবা হাইপোথাইরয়েড আক্রান্ত  হয় তাহলে চিকিৎসককে পূর্বেই তা জানানো উচিত। 


নবজাতকের জন্ডিসের চিকিৎসা

বয়স্কদের তুলনায় শিশুদের দেহের রেড  সেল ভলিয়ম বা লোহিত রক্তকণিকা অনেক বেশি পরিমাণে হয়ে থাকে। আর এই লোহিত রক্ত কণিকা স্থায়িত্ব খুবই কম থাকে। যার ফলে লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে গিয়ে বিলুরুবিন  অনেক বেশি পরিমাণে তৈরি হয়। কিন্তু শিশুদের লিভার পুরোপুরি কার্যক্ষম  না হওয়ার ফলে শরীরে বিলুরুবিন জমে যায়। আর এই জমে যাওয়ার ফলে শিশুদের জন্ডিস অনেক বেশি হয়ে থাকে।

তবে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে জন্ডিসের মাত্রা যদি বেশি মনে হয় অর্থাৎ বিলুরুবিন ১৪ বা তার বেশি হলে শিশুকে হাসপাতালে এনে ফটো থেরাপি দিতে হবে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে যে শিশুর জন্মের পর তার রক্তে বিলুরুবিনের  মাত্রা কেমন ,শিশু কত সপ্তাহে জন্মগ্রহণ করেছে কিংবা শিশুর রক্তে বিলুরুবিন কি পরিমাণে বাড়ছে তার উপর নির্ভর করে চিকিৎসা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। 

তবে শিশু জন্মের পর তাকে বেশি পরিমাণে বুকের শালদুধ খাওয়াতে হবে।  বেশি পরিমাণে বুকের শাল দুধ খাওয়ানোর ফলে শিশুর বারবার পায়খানা হবে এবং পায়খানার মাধ্যমে শরীরের জমে থাকা বিলুরুবিন  বের হয়ে যাবে।  কিছু কিছু ক্ষেত্রে যখন নবজাতকের বিলুরুবিন এর মাত্রা অতিরিক্ত হয় তখন নবজাতককে রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন পড়তে পারে। 

আবার কোন কোন সময় ইন্ট্রাভেনাস ইমিউনোগ্লোবিউলিনও লাগাতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় শিশুকে এক থেকে দুই দিন ফটো থেরাপি দেওয়ার মাধ্যমে জন্ডিস সহনীয় মাত্রায় চলে যায়।  তবে যখন বিলুরুবিন এর মাত্রা অতিরিক্ত হয় তখন শিশুর মস্তিষ্ক ক্ষতি হতে পারে। তাছাড়া অনেক ধরনের জটিলতার মধ্যে সেরিব্রাল পালসি ,কান নষ্ট হয়ে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যা গুলো হতে পারে। তবে এগুলো খুবই অল্প পরিমাণই দেখা যায়।

x

Post a Comment

0 Comments