Ticker

6/recent/ticker-posts

পালং শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা


 

পালং শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা

আমাদের দেশে খুবই পরিচিত একটি নাম হচ্ছে পালং শাক। আমরা পালং শাক  বিভিন্নভাবে খেয়ে থাকি। কেউ ভাজি করে খায় কিংবা কেউ রান্না করে খায়। পালং  শাকে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টিগুণ যা আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখতে অনেক বেশি সহায়তা করে। তাছাড়া পালং শাক খাওয়ার মাধ্যমে নানা রকম অসুখ বিসুখ  থেকে দূরে থাকা যায়।

পালং শাক হচ্ছে এক প্রকার সপুষ্পক উদ্ভিদ। এটার আদিনিবাস হচ্ছে দক্ষিণ পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ায়। এটি এক ধরনের এক বর্ষজীবী উদ্ভিদ তবে দ্বিবর্ষজীবি উদ্ভিদ গাছ হতেও দেখা যায় যদিও এটি বিরল। পালং শাকের দীর্ঘ  সাধারণত ত্রিশ  সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে।

তবে বাংলাদেশ এর চাষ ব্যাপক হারে শীতকালে দেখা যায়। পালং শাকের ফুলগুলো সাধারণত হলদেটে সাদা রঙের হয়ে থাকে এবং এর ফল ছোট, শক্ত, দানা কৃতির ও গুচ্ছাকার হয়ে থাকে। আজকে আমরা আমাদের এই পোস্টে পালং শাকের নানা উপকারিতা, এর পুষ্টিগুণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো।


সূচিপত্র:

  • পালং শাকের উপকারিতা ও অপকারিতা
  • পালং শাকের পুষ্টিগুণ
  • পালং শাক এর উপকারিতা
  • পালং শাকে কি এলার্জি আছে
  • পালং শাকের অপকারিতা


পালং শাকের পুষ্টিগুণ

পালং শাক যদিও শীতকালে চাষ করা হয় তবুও সারা বছর এই শাক পাওয়া যায়। এই শাকে দারুন সব পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ উপকারী উপাদান রয়েছে। প্রতি 100 গ্রাম পালং শাকের মধ্যে রয়েছে প্রোটিন দুই গ্রাম।

তাছাড়া অন্যান্য উপাদানের মধ্যে রয়েছে কার্বোহাইড্রেট আছে ২.৮ গ্রাম, আঁশ আছে ০.৭ গ্রাম, আয়রন ১১.২ মি. গ্রাম, ফসফরাস আছে ২০.৩ মি. গ্রাম, অ্যাসিড (নিকোটিনিক) ০.৫ মি. গ্রাম, রিবোফ্লোবিন আছে .০৮ মি. গ্রাম, অক্সালিক অ্যাসিড আছে  ৬৫২ মি. গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৭৩ মি. গ্রাম, পটাশিয়াম থাকে ২০৮ মি. গ্রা, ভিটামিন-এ থাকে  ৯৩০০ আই. ইউ, থায়ামিন আছে .০৩ মি. গ্রাম, ভিটামিন সি ২৭ মি. গ্রাম।

তাছাড়া পালং শাক শরীরের অন্ত্রকে সচল রাখতে অনেক বেশি সহায়তা করে। যেসব রোগী ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তারা যদি পরিমাণ মতো পালং শাক খায় তাহলে এটা তাদের জন্য অনেক বেশি উপকারী। তাছাড়া জন্ডিসের জন্য পালং শাক বিশেষ উপকারী।


পালং শাক এর উপকারিতা

আমরা পূর্বে জেনেছি পালং শাকের রয়েছে প্রচুর পুষ্টিগুণ। আমরা পালং শাক খাওয়ার মাধ্যমে আমাদের দেহকে সুস্থ থাকা সহ অনেক রোগব্যাধি হতে মুক্তি পেতে পারি। চলুন এবার জেনে নেওয়া যাক পালং শাকের কিছু উপকারিতা সম্পর্কে।

  1. ওজন কমাতে পালং শাকে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার, এন্টিঅক্সিডেন্ট ,আয়রন, ফলেট, ম্যাগনেসিয়াম ,ক্যালসিয়াম এবং আরো অনেক ধরনের ভিটামিন ও খনিজ। এগুলো আমাদের শরীরের প্রবেশ করার পর আমাদের ওজন হ্রাসের প্রক্রিয়াকে তুরান্বিত করে। তাই আপনি যদি আপনার খাদ্য তালিকায় নিয়মিত এই শাক টি  রাখতে পারেন তাহলে আপনার শরীরের অতিরিক্ত মেদ ঝরে যাবে। 
  2. রক্তচাপ কমাতে পালংশাকে রয়েছে উচ্চমাত্রার ম্যাগনেসিয়াম ,যার ফলে নিয়মিত পালং শাক খাওয়ার মাধ্যমে আপনার রক্তচাপ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসতে সাহায্য করবে। তাই আপনি আপনার শরীরের রক্তচাপ কমানোর জন্য নিয়মিত পালং শাক খেতে পারেন। 
  3. লবণের ভারসাম্য রক্ষা করতে আমাদের অনেক সময় লবণের ভারসাম্য শরীর থেকে হারিয়ে যায়। পালং শাকে রয়েছে বিপুল পরিমাণে পটাশিয়াম, আর এই খনিজ টি আমাদের শরীরের সোডিয়াম বা লবণের হারিয়ে যাওয়া ভারসাম্যকে ফিরিয়ে আনতে অনেক বেশি সাহায্য করে। 
  4. কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে আমরা অনেকেই অনেক সময় কোষ্ঠকাঠিন্যতে ভুগে  থাকি। যার কারণে আমাদের স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে অনেক সমস্যা হয়। এমনকি বিভিন্ন ধরনের খাবার খেতে অনেকে ভয় পায়। যেহেতু পালং শাকে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আঁশ  তাই আপনার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার জন্য পালং শাক হতে পারে একটি উপকারী খাদ্য। আপনার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার জন্যে পালংশাক নির্ভয়ে খেতে পারেন। 
  5. মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে আমাদের মস্তিষ্কের কোষগুলোকে সুস্থ রাখতে পালংশাকের যে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে তা অনেক বেশি সাহায্য করে থাকে। পাশাপাশি মস্তিষ্কের কোষগুলোকে সতেজ ও কর্মক্ষম রাখার জন্য পালং শাকের এন্টিঅক্সিডেন্ট খুবই উপকারী এবং এন্টিঅক্সিডেন্ট মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয়। 
  6. চোখের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকার সবুজ শাকসবজিতে রয়েছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধরনের ফাইটকেমিক্যাল। এগুলো আমাদের দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি হওয়া থেকে বাধা প্রদান করে থাকে। আর পালং শাকে রয়েছে উচ্চমাত্রার বিটা ক্যারোটিন যা আমাদের চোখের ছানি পড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি থেকে মুক্তি দেয়।
  7. কোলেস্টেরল কমাতে পালং শাকে রয়েছে অনেক ধরনের পুষ্টিগুণ,যা আমাদের শরীরের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে নিয়ন্ত্রণ রাখতে অনেক বেশি সহায়তা করে। 
  8. ত্বকের স্বাস্থ্য রক্ষায় পালং শাকে রয়েছে ভিটামিন এ যা আমাদের ত্বকের বাহিরের স্তরের আদ্রতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে অনেক বেশি ভূমিকা পালন করে থাকে। আমাদের ত্বকের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা যেমন ব্রণ ,বলি রেখা  পড়া ইত্যাদি দূরীকরণের ক্ষেত্রেও অনেক বেশি কার্যকর। তাছাড়া এটা আমাদের দেহের বয়সের ছাপ পড়ার গতিকে দূর করে এবং স্থিতিস্থাপক অবস্থাকে ধরে রাখতে অনেক বেশি সহায়তা করে। 
  9. কোলনের ক্ষেত্রে আমরা জানি পালং শাকে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি এবং ভিটা ক্যারোটিন। এই দুইটি উপাদান আমাদের কোলনের কোষগুলোকে রক্ষা করে। 
  10. শরীরের ক্লান্তি ভাব দূর করার ক্ষেত্রে পালং শাকে রয়েছে উচ্চ মাত্রার আয়রন যা আমাদের দেহের অক্সিজেন উৎপাদনের জন্য অনেক বেশি জরুরী। তাছাড়া এতে রয়েছে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুলি ভিটামিন সি ও ই কে তুরান্নিত করে আমাদেরকে আবার পুনরুজ্জীবিত করতে খুবই কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। যার ফলে আমাদের শরীরের ক্লান্তি ভাব দূর হয়। 
  11. স্মৃতিশক্তির ক্ষেত্রে আমরা জানি পালং শাকে রয়েছে পটাশিয়াম ,ফলেট  এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এই তিনটি উপাদান যদি আমাদের শরীরে নিয়মিত যায় তাহলে আমাদের মস্তিষ্কের বিশেষ বিশেষ অংশের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। যার ফলে স্মৃতিশক্তি মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায় ,সাথে পটাশিয়ামের দৌলতে আমাদের কাজের প্রতি মনোযোগের ক্ষমতার উন্নতি ঘটে। তাই আপনার মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়াতে পালং শাক অনেক বেশি কার্যকর।
  12. হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখতে পালংশাকে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফলিক এসিনেজা যেগুলো আমাদের দেহের সুস্থ কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমের জন্য অনেক বেশি জরুরী। তাই আপনি আপনার হৃদ যন্ত্র কে ভালো রাখার জন্য সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য এই সবজিটি আপনার খাদ্য তালিকায় নিয়মিত রাখতে পারেন। 
  13. হজম ক্ষমতার বৃদ্ধিতে পালং শাকের রয়েছে অ্যামাইনো এসিড। এটি এমন একটি উপাদান যা মেটাবলিজম রেট বাড়াতে অনেক বেশি সাহায্য করে। আর এই মেটাবলিজম রেট বৃদ্ধির কারণে আমাদের হজম ক্ষমতার উন্নতি হয়। 
  14. ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কাজ করে পালং শাকে রয়েছে ১০টিরও বেশি ভিন্ন ধরনের ফ্ল্যাভোনয়েড যা আমাদের দেহের ভয়ানক রোগ গুলোর  বিরুদ্ধে কাজ করে। এই পলিনিউট্রিয়েন্টস গুলো দেহের ফ্রি রেডিকেলকে নিরপেক্ষ করে থাকে । যার ফলে আমাদের দেহ থাকে ক্যান্সার এর প্রভাব থেকে মুক্ত।
  15. জন্ডিসের ক্ষেত্রে পালংশাকে এমন সব বিশেষ উপকারী উপাদান রয়েছে যা আমাদের জন্ডিসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য অনেক বেশি উপকারীএকটি খাবার। 
  16. কিডনির জন্য অনেক বিশেষজ্ঞদের মতে পরিমাণ মতো ও নিয়মিত পালন শাক খাওয়ার মাধ্যমে এর ভিতর থাকা খাদ্য গুনাগুনের ফলে ,কিডনিতে পাথর থাকলে তা গুড়ো হয়ে বের হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।


পালং শাকে কি এলার্জি আছে

আমরা জানি পালং শাক হচ্ছে উচ্চ ফাইবার সমৃদ্ধ একটি খাবার পালং শাক খাওয়ার ফলে পেটে গ্যাস , ফোলা ভাব কিংবা ক্র্যাম্পের  মত সমস্যাগুলো তৈরি হতে পারে।  তবে সবুজ শাকসবজিতে প্রচুর পরিমাণে হিস্টামিন থাকে। আর এই হিস্টামিন হলো এমন একটি রাসায়নিক যা আমাদের দেহের কিছু কোষের পাওয়া যায়। যার ফলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এলার্জির প্রতিক্রিয়া ঘটতে পারে। তাই যাদের পালং শাক খাওয়ার ফলে এলার্জি হয় তাদের এটা এড়িয়ে চলাই উচিত।


পালং শাকের অপকারিতা

পালং শাক হচ্ছে একটি পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ সবজি। এই সবজি রয়েছে অসংখ্য স্বাস্থ্য উপকারিতা। যাইহোক পালং শাক খাওয়ার ফলে যেমন আমরা বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য উপকারিতা পেয়ে থাকে পাশাপাশি এর কিছু অপকারিতা রয়েছে। তাই খাওয়ার আগে অবশ্যই আমাদের এটা সম্পর্কে একটু সচেতন হয়ে নিতে হবে। চলুন এবার জেনে নেওয়া যাক পালং শাকের কিছু অপকারিতা সম্পর্কে।

  1. পালন শাক হচ্ছে সবচেয়ে ভারী কীটনাশক দূষিত সবজিগুলির মধ্যে একটি সবজি। যা আমাদের মানব দেহের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতি কারণ হতে পারে। কীটনাশকের সংস্পর্শ কমানোর জন্য এবং জৈব পালং শাক কেনার বা খাওয়ার আগে অবশ্যই পালং শাক ভালোভাবে  ধুয়ে নিতে হবে। 
  2. কিছু মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায় পালং শাক খাওয়ার ফলে এলার্জি হতে পারে। যার ফলে চুলকানি,শ্বাসকষ্টের মত লক্ষণ গুলো প্রকাশ পেয়ে থাকে। তাই আপনি যদি পালং শাক খাওয়ার ফলে এরকম কোন প্রতিকূল প্রতিক্রিয়া অনুভব করে থাকেন ,তাহলে অবশ্যই এটি এড়িয়ে যাওয়ায় উচিত এবং প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে পারেন। 
  3. পালং শাকে রয়েছে অনেক বেশি পরিমাণে পিউরিন ,যা ইউরিক এসিডের সাথে ভেঙে গিয়ে গাউট এর বিকাশে অবদান রাখতে সাহায্য করে। গাউট  বা উচ্চ ইউরিক এসিডের মাত্রা আছে এরকম ব্যক্তিদের পালং শাক না খাওয়াই উচিত। 
  4. পালংশাকে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম। আর অতিরিক্ত মাত্রায় ক্যালসিয়াম গ্রহণ করার ফলে হৃদরোগ হওয়া সম্ভাবনা থাকে। তাই এটা অতিরিক্ত পরিমাণে না খাওয়াই উত্তম।
  5. পালং শাকের রয়েছে ফাইবার উপাদান যা অত্যাধিক গ্রহণ করার ফলে পেট ফাঁপা, পেট ফোলা ভাব এবং পেটে ক্র্যাম্পের  মতো সমস্যা হতে পারে। 
  6. তাছাড়া পালংশাকে উপস্থিত পটাসিয়াম ধূমপানকারী ব্যক্তিদের জন্য ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। 
  7. যেসব ব্যক্তিদের কিডনি সংক্রান্ত রূপ রয়েছে তাদেরকে পালং শাক খাওয়ার জন্য নিরসাহিত করা হয়।


পরিশেষে পালং শাক হচ্ছে একটি উচ্চ পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ একটি সবজি। যা আমাদের বিভিন্ন স্বাস্থ্য উপকারিতা প্রদান করে থাকে। এতে রয়েছে ভিটামিন, খনিজ, এন্টি এক্সিডেন্ট ইত্যাদি যা আমাদের চোখের স্বাস্থ্য উন্নতির ক্ষেত্রে, হৃদরোগের উন্নতির ক্ষেত্রে, হাড়ের স্বাস্থ্যকে সমর্থন করতে ,ক্যান্সার প্রতিরোধের ক্ষেত্রে, রক্তের শর্করাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে, মস্তিষ্কের কার্যকারিতা উন্নত করার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সহায়তা প্রদান করে থাকে। তাই আপনি আপনার স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য পালং শাক নিয়মিত খেতে পারেন।

Post a Comment

0 Comments