Ticker

6/recent/ticker-posts

পবিত্র আখেরি চাহার সোম্বা


 

পবিত্র আখেরি চাহার সোম্বা

আখেরি চাহার সোম্বা দিবসটি মুসলিম ধর্মালম্বীদের কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি স্মারক দিবস। এই দিবসটি  পালিত হয় শুকরিয়া দিবস হিসেবে। এটা হিজরী সনের সফর মাসের শেষ যে বুধবার সেই বুধবার মুসলিম বিশ্বে অত্যন্ত মর্যাদা পূর্ণ স্মারক দিবস হিসেবে পবিত্র আখেরি চাহার  সোম্বা পালন  হয়ে থাকে। এই দিবসটি পালন করার কারণ হচ্ছে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ইন্তেকাল পরবর্তী সময়ে অনেকদিন অসুস্থ থাকার পর কিছুটা সুস্থতা বোধ করেছিলেন এই দিনে।


ফার্সিতে এই দিনটাকে আখেরি চাহার সোম্বা  হিসেবে অবহিত করা হয়। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এই দিনে তার পুরো জীবনে শেষবারের মতো রোগ  থেকে মুক্তি লাভ করে কিছুটা সুস্থতা অনুভব করেছিলেন। আর এই জন্য এই দিনটিকে মুসলমানরা প্রতি বছর শুকরিয়া দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। তারা এই দিনে নফল ইবাদত বন্দেগির মাধ্যমে দিনটিকে অতিবাহিত করে থাকে।মুসলিম উম্মার কাছে পবিত্র আখেরি চাহার সোম্বার  গুরুত্ব ও মহিমা অপরিসীম।


সূচিপত্র :

  • পবিত্র আখেরি চাহার সোম্বা
  • আখেরি চাহার সোম্বা মানে কি
  • আখেরি চাহার সোম্বার ইতিহাস
  • আখেরি চাহার সোম্বার দিন করণীয়
  • আখেরি চাহার সোম্বা সম্পর্কিত কিছু বিদআত


আখেরি চাহার সোম্বা মানে কি

আখেরি চাহার সোম্বা এই বাক্যটি আরবি ও ফারসি শব্দের সমষ্টি। যার অর্থ আলাদা আলাদাভাবে করলে দাঁড়ায় আখেরি আরবি শব্দ ,এটার অর্থ হচ্ছে শেষ। চাহার  শব্দটি হচ্ছে ফার্সি  যার অর্থ চতুর্থ আর সোম্বা  শব্দটিও হচ্ছে ফারসি, সোম্বা শব্দের অর্থ হচ্ছে বুধবার। অর্থগত দিক থেকে পুরো বাক্যটিকে একসাথে করলে হয় সফর মাসের শেষ বুধবার বা সফর মাসের শেষ চতুর্থ বুধবার এই দিনটিকে মুসলিম উম্মাহ খুশির দিন হিসেবে জানে এবং এই দিন টিকে  খুশির দিন হিসেবেই পালন করে আসছে।


আখেরি চাহার সোম্বার ইতিহাস

ইসলামী স্কলার্সদের মাঝে আখেরি চাহার সোম্বা এর ইতিহাস এবং আখেরি চাহা সোম্বা  দিবস পালন করার ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের মতামত রয়েছে। অনেকেই বলেছেন আখেরি চাহার সোম্বা ব্যাপারে যে ইতিহাস রয়েছে বা যে ইতিহাস প্রচলিত রয়েছে তা আসলে সঠিক নয় বরং এটি একটি ভুল ইতিহাস। তারা অনেকেই বলেন যে প্রচলিত ইতিহাসটি হাদিসের বিরুদ্ধে এবং এর দোয়া বলতে কোন দোয়া নেই।আবার যারা এই দিবস টিকে  পালন করে থাকে তারা এই দিবসটি পালন করার মাধ্যমে অনেক সওয়াবের কাজ বলে মন্তব্য করে। নিচে আখেরি চাহার সোম্বা  সম্পর্কে বিস্তারিত ইতিহাস তুলে ধরা হলো।

আখেরি চাহার সোম্বা এই সম্পর্কে একটি ঘটনা হলো হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম সফর  মাসের শেষের দিকে কোন এক রাতের বেলা বাকিউল গারকত নামক কবরস্থানে গিয়ে সেখানে মৃত ব্যক্তিদের জন্য মোনাজাত করেন এবং সেই জায়গা থেকে ফিরে আসার পর তিনি অসুস্থ হয়ে যান।  তিনি বুঝতে পারেন যে এই অসুস্থতার ফলেই তিনি মৃত্যুবরণ করবেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বাকিউল গারকাদ নামক কবরস্থানে মোনাজাত করতে যান তখন তার সাথে তার মুক্ত ক্রীতদাস হিবা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন যে ,আল্লাহতালা আমাকে দুইটি বিষয়ের মধ্যে যে কোন একটি বিষয় গ্রহণ করার স্বাধীনতা দিয়েছেন। সেই দুটি স্বাধীনতা হলো একটি হচ্ছে দুনিয়ার সকল ধন ভান্ডার এর চাবি এবং দীর্ঘজীবন অন্যটি হলো জান্নাত। তখন ইবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম কে বলেন যে ,আপনি প্রথমটি পছন্দ করেন তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন যে তিনি ইতিমধ্যে দ্বিতীয়টি পছন্দ করে ফেলেছেন।
যাই হোক সেই কবরস্থান থেকে ফিরে আসার পর হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম অসুস্থ হয়ে পড়েন কিন্তু তিনি কোনোভাবেই কোনো ওষুধের মাধ্যমেই  সুস্থ হয়ে উঠছিলেন না। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এই অসুস্থতার মাধ্যমেই তিনি মৃত্যুবরণ করবেন।  হঠাৎ একদিন সকালবেলা তিনি সুস্থতা বোধ করেন এবং তার নাতিদয়ের সাথে দুপুরের খাবার খান এবং স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করেন। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর সুস্থতায় সকলেই অনেক বেশি আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় এবং সকলে নিজেদের সাধ্যমত দান খয়রাত করে আনন্দটাকে উদযাপন করতে থাকে। মূলত উপরের যে ঘটনাটা তুলে ধরা হয় সেটি আখেরি চাহার সোম্বা  এর ইতিহাস।

আখেরি চাহার সোম্বার দিন করণীয়

বিভিন্ন ইসলামী গ্রন্থে আখেরি চাহার  সোম্বা সম্পর্কে বা এই দিনের করনীয় সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু এই বিবরণ গুলো কতটুকু সঠিক বা কতটুকু ইসলাম সম্মত সেই বিষয়গুলো নিয়ে ইসলামিক স্কলারদের মাঝে রয়েছে অনেক মতপার্থক্য। কিছু কিছু বইয়ে আখেরি চাহার সোম্বা  সম্পর্কে কিছু আমলের বিবরণ রয়েছে। তবে অধিকাংশ আলেমই দাবি করেন যে এই আমল গুলো সম্পূর্ণরূপে মনগড়া ও কুরআন-হাদিস পরিপন্থী। কেননা এই ধরনের বিশেষ কোনো আমল পবিত্র কুরআন ও হাদিসে কোথাও স্পষ্ট প্রমাণ নেই।

সেই ক্ষেত্রে আপনি যদি একজন প্রকৃত মুসলিম হয়ে থাকেন তাহলে আপনার কর্তব্য হচ্ছে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের যে সকল তথ্য রয়েছে সেগুলো মেনে নিয়ে তার উপর আমল করা। আর আপনি যদি সওয়াবের উদ্দেশ্যে কোন আমল করতে চান তাহলে অবশ্যই আপনার এই আমলটি পবিত্র কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হতে হবে। যে সমস্ত আমল কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয় সেই সমস্ত আমল যদি আপনি সওয়াবের উদ্দেশ্যে করে থাকেন তাহলে আপনার সওয়াবের পরিবর্তে পাপ হবে। কেননা মনগড়া যে কোন আমল মারাত্মক গুনাহের কাজ।

এখন আমাদের সবার প্রশ্ন হচ্ছে আখেরি চাহার সোম্বা দিন কি বিশেষ কোন আমল রয়েছে ?বা আখেরি চাহার সোম্বা দিন আমাদের করণীয় গুলো কি ?এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে অনেক আলেমগণ উল্লেখ করেছেন যে যেহেতু আখেরি চাহার সোম্বা দিন এর করনীয় সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসের কোন ধরনের তথ্য নেই তাই এর বিশেষ কোনো আমলও নেই। যদিও বিশেষ কিছু গ্রন্থে আখেরি চাহার সোম্বা দিন করনীয় বা এর আমল সম্পর্কে বিবরণ রয়েছে।কিন্তু এই আমলগুলোর সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং মনগড়া আমল।  কেননা পবিত্র কুরআন বা সহীহ হাদীসে আখেরি চাহার সোম্বা  সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।

তাই একজন মুসলিম হিসেবে আখেরি চাহার সোম্বা দিন আপনার বিশেষ কোন আমল করার তেমন একটা প্রয়োজন নেই। আমাদের দেশে বা আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে অনেকেই এই দিনে বিভিন্ন ধরনের আনন্দ উৎসব করে থাকে বা বিভিন্ন ধরনের আমল করে থাকে। যেগুলো তারা কুরআন ও হাদিসকে তোয়াক্কা না করেই নিজেদের মন মতো এই অনুষ্ঠানগুলো করে থাকে। তাই আপনি যদি নিজেকে বিদআত  থেকে মুক্ত রাখতে চান তাহলে অবশ্যই আখেরি চাহার সোম্বা দিন কোন অনুষ্ঠানে যোগদান না করায় আপনার জন্য শ্রেয়।



আখেরি চাহার সোম্বা সম্পর্কিত কিছু বিদআত

আখেরি চাহার সোম্বা নিয়ে বিশেষ কিছু বিদআত রয়েছে যেগুলো সম্পর্কে আমাদের সবার ধারণা থাকা উচিত। চলুন সেই বিদআত গুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক। 

বিদাত -১ বিশেষ নামাজ আদায় করা: অনেকেই এই দিন মাগরিবের নামাজের পর বিশেষ ধরনের নামাজ আদায় করে থাকে। আর এই দিন এই ধরনের নামাজ আদায় করা বিদআত। যদিও আমরা জানি নামাজ আদায় করা সওয়াবের কাজ কিন্তু আপনাকে তা অবশ্যই ইসলামের নিয়ম নীতি মেনে নামাজ আদায় করতে হবে। ইসলামের নিয়ম নীতি না মেনে যদি আপনি নামাজ আদায় করেন তাহলে কখনোই সেই নামাজ পড়ে আপনি সফল হবেন না বা সওয়াবের  অংশীদার হবেন না। তাই আখেরি চাহার সোম্বার  দিন বিশেষ কোনো নামাজ পড়ার প্রয়োজন বা বিশেষ কোনো নামাজ আদায় করবেন না। 

বিদাত দুই আনন্দ প্রকাশ করা: আমাদের আশপাশে কিছু কিছু লোক রয়েছে যারা এই দিন ঈদের মতো আনন্দ উদযাপন করে থাকে। তারা মনে করে যে যেহেতু এই দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম সুস্থতা বোধ করেছিলেন তাই এটি অনেক আনন্দের দিন।  যদি আখেরি চাহার সোম্বা  দিন এই আমলটি বা আনন্দ প্রকাশ করার বিষয়টি থাকতো তাহলে যুগ যুগ ধরে সাহাবায়ে কেরামগণ আনন্দ প্রকাশ করে আসতেন। অথচ এই আমলটি শুরু হয়েছে সাহাবায়ে কেরামের অনেক যুগ পর থেকে। তাই এই দিনকে ঘিরে আনন্দ উদযাপন করা বিদআত। 

বিদাত-৩ সফর মাসকে অশুভ মনে করা: অনেকেই মনে করে থাকে যে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম সফর মাসে যেহেতু অসুস্থ হয়েছিলেন সেহেতু এই মাসটি অশুভ। অথচ ইসলামে এর কোন ভিত্তি নেই। কেননা কোন মাসে অশুভ নয় সকল মাস আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি। তাই কেউ যদি মনে করে থাকে যে সফর মাস অশুভ  তাহলে সে এটি মনগড়াভাবে মনে করল। কেননা এই বিষয়ে কুরআন হাদিসে স্পষ্ট করে কোথাও কোন কিছু লেখা নেই। সুতরাং এই ধরনের মনগড়া বিষয় থেকেও আমাদের সব সময় সতর্ক থাকতে হবে।


পরিশেষে উপরোক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে আখেরি চাহার সোম্বার বিশেষ কোন আমল নেই বা এর কোন নির্দিষ্ট দলিল হাদিস বা কুরআনে কোথাও লিপিবদ্ধ নেই। তাই এই  উপলক্ষে বিশেষ কোনো আমল করা বিদআত। আমাদের এসব বিদআত থেকে সতর্ক থাকতে হবে।

Post a Comment

0 Comments